TRENDS

দিদি কাগজ দিয়েছে, ভাইরা জমি দেয়নি! পশ্চিম মেদিনীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া পাট্টার কথা জানেই না দল আর প্রশাসন

Chandramani Saha

নিজস্ব সংবাদদাতা: রঙ্গ আর রসিকতার আরেক নামই বোধহয় বঙ্গীয় রাজনীতি আর প্রশাসন। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী নিজের হাতে তুলে দিয়েছেন ভূমিহীনকে পাট্টা। লুকিয়ে নয়, প্রকাশ্য প্রশাসনিক সভায় আর মুখ্যমন্ত্রীর সভা মনে গোটা নবান্ন আর গোটা জেলা, পুরো দল হাজির থাকে। সেই সভা থেকেই তুলে দেওয়া হয়েছিল পাট্টা। মুখ্যমন্ত্রী নিজের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, ২ বছর পরে এখন কেউ বলছে জানিনা আর কেউ বলছে এই সবে জানলাম। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর কাগজ রয়ে গেছে ঘরেই আর জমি রয়ে গেছে জমির জায়গাতেই।শুধু তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া জমির দখল নিতে হলে দিতে হবে কাটমানি এমন অভিযোগও উঠেছে।

বছর দুই আগে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর তুলে দেওয়া পাট্টা হাতে করে ভূমিহীন মানুষটি হন্যে হইয়ে ঘুরেছেন স্থানীয় শাশক দলের নেতা ও জন প্রতিনিধিদের কাছে। পাট্টা পাওয়া জমির দখল পেতে ছুটেছেন মুখ্যমন্ত্রীর কালীঘাটের বাড়িতেও। তাঁর পরেও সুরাহা হয়নি। ঘটনা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা-১ ব্লকের লক্ষ্মীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের শ্রীনগর গ্রামের অসীমা পাখিরার তাই নিজের জমিতে মাথার ওপর ছাদ অধরাই থেকে গেছে।

পাট্টার ওপর দিনটা লেখা রয়েছে, ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনিক সভা থেকে চন্দ্রকোনার শ্রীনগর গ্রামের বাসিন্দা অরূপ পাখিরা পেশায় কাঠের মিস্ত্রির স্ত্রী অসীমা পাখিরার হাতে গ্রামেরই একটি খাস জায়গার মধ্য থেকে দুই শতক জায়গার পাট্টা তুলে দেন। পাট্টা পাওয়ার পর দুই বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এখনও সেই পাট্টায় উল্লিখিত জায়গার দখল পাননি।

অসীমার স্বামী অরূপের অভিযোগ, জায়গার পাট্টা পাওয়ার পর দখল নেওয়ার জন্য স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের কাছে যায়। স্থানীয় তৃণমূল নেতারা জায়গা দখল দেওয়ার জন্য ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। নেতৃত্বের দাবি মতো টাকা দিতে না পারায় আজও পাট্টা পাওয়া জায়গার দখল নিতে পারিনি। তিনি বলেন, সবার কাছে ছুটেছি। কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে গিয়েও বিষয়টি জানিয়ে এসেছি। তারপরেও সমস্যার সমাধান হয়নি’।

ঘটনা প্রসঙ্গে চন্দ্রকোনা-১ ব্লকের বিডিও অভিষেক মিশ্র বলেন, ‘ বিষয়টি জানা ছিলনা। শোনার পর বিএলআরও কে দিয়ে ওই পরিবারকে ডাকিয়ে হেয়ারিং করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া পাট্টার নির্দিষ্ট সরকারি জায়গা ওই ব্যক্তিকে কেন দেওয়া হলো না! তদন্ত করে দেখা হচ্ছে’ চন্দ্রকোনা-১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সূর্যকান্ত দোলোই বলেন, ‘এই বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। পাট্টা পাওয়ার পর এতদিন যে ওই ব্যক্তি জায়গার দখল পাননি তাও আমাদের জানাননি। আমরা ভূমি দপ্তর কে দিয়ে ক্ষতিয়ে দেখে, ওই ব্যক্তিকে দ্রুত জায়গার দখল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর যদি এই ঘটনায় দলের কেউ জড়িত থাকে, তাহলে প্রশাসনিক ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।

অরূপের দাবি, জায়গার দখল না পেয়ে বারবার স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের কাছে গেছি। তৃণমূল নেতৃত্ব টাকা দাবি করেন। তিনি বলেন, এত টাকা আমি কোথায় পাবো। তাই টাকা দিতে পারিনি। অরূপের অভিযোগ অস্বীকার করেন ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি সুজয় পাত্র। তৃণমূলের ব্লক সভাপতি বলেন, ‘আমি ২০১৯ সালে ব্লক সভাপতি হয়েছি। মাস খানেক আগে ঘটনার কথা জানতে পারি। খোঁজ নিয়ে দেখেছি টাকা নেওয়া বা চাওয়ার কোন গল্প নেই। ওনাকে যে জায়গার পাট্টা দেওয়া হয়েছে সেই জায়গা অনেক আগে থেকে একজন আদিবাসী লোক দখল করে বসে আছেন। ভুল করে হয়তো পাট্টায় ওই জায়গার উল্লেখ হয়ে গেছে। তবে ওই ব্যক্তিকে বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এখন উনি যা অভিযোগ করছেন সব মিথ্যে।’
বোঝ কান্ড! এখানেও সেই ভুল, যেমনটা হামেশাই ভুল করে আমফানে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ টাকা ঢুকে যাচ্ছে গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের আত্মীয় স্বজন, শাসকদলের নেতাদের আ্যকাউন্টেই। খাস জমির পাট্টা কারা কারা পাবে, কোন জমি পাবে এটা তো স্থানীয় পঞ্চায়েত বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে শাসকদলের নেতারাই ঠিক করেন। সেই ভুলের মাশুল ২বছর ধরে ভূমিহীনকেই গুনে যেতে হবে?

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join