TRENDS

সুবর্নরেখার কথা – ৭ ।। উপেন পাত্র

Abhirup Maity

যুগী বা নাথ ধর্ম সম্প্রদায়

সুবর্ণরেখা নদী অববাহিকায় যুগী বা নাথ নামে এক ধর্ম সম্প্রদায় দেখা যায়।গোপীবল্লভপুর ১ নং ব্লকে এই ধর্ম সম্প্রদায়ের “কুড়িচা মঠ” নামে এক আশ্রম আছে।যুগীরা সাধারণত গেরুয়া বসন পরিধান করে।অতীতের লোক বিশ্বাস মতো যুগীরা নাকি পিশাচসিদ্ধ হয়,ভুত প্রেত তাড়াতে পারে।তাই এদের সম্পর্কে স্থানীয় লোকেদের একটা সমীহ ভাব ছিল।একটি প্রবাদও প্রচলিত ছিল– “যেঠে নাই যুগীর বসতি,ধর্ম কর্ম সব নাস্তি।”
যুগীরা রাতের বেলা ডমরু বাজিয়ে “শিব দোহা” গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো।লোকেরা সমীহ করে তাদের ঝুলিতে “সিধা” দিতো।সিধা বলতে চালের সাথে কিছু আনাজপাতি বোঝায়।গানের সাথে একটানা ডমরু বেজে চলতো।লোক বিশ্বাস মতো এদের সাথে নাকি ভুত প্রেত ঘুরে বেড়ায়,তাই ডমরু বাদ্য বন্ধ হওয়ার অর্থ সর্বনাশ হবে, ভুত প্রেতরা অনর্থ ঘটাবে।
পূর্বে উল্লিখিত কুড়িচা মঠের বেশ নামডাক ছিল।

আশ্রম এলাকার ভেতর দিয়ে কেউ জুতো পায়ে ছাতা মাথায় দিয়ে যেতে পারতো না।এই অঞ্চলে নাথদের আদি হলেন শবধনাথ,তাঁর নাকি অলৌকিক যোগবল ছিল।তৎকালীন সময় সুবর্ণরেখা নদী পর্যন্ত ময়ুরভঞ্জ মহারাজার অধীন ছিল।শবধনাথের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে ময়ুরভঞ্জের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভঞ্জ এই কুড়িচা মৌজাটি তাঁকে দান করেন।কুড়িচা থেকে তিন মাইল দুরে ছাতিনাশোল গ্রামে ময়ুরভঞ্জ রাজ এস্টেটের ভগ্ন কাছারি বাড়ি দেখা যায়।
যুগী ধর্মমতে শিব আদি গুরু বা আদিনাথ,শিবের কাছ থেকে তন্ত্রসাধনা শিক্ষা করে বিন্দুনাথ, গোরক্ষনাথ হয়ে গুরু পরম্পরায় এই ধর্ম চলে আসছে।বর্তমানে কুড়িচা টোপগাড়িয়াতে ষোলটি যুগী পরিবারের বাস আছে।এছাড়া গোপীবল্লভপুর ২ নং ব্লকে ফুটিপাল গ্রামে কিছু যুগী পরিবার বাস করে।যুগীদের সাধারণ পদবি হলো নাথ ও ভারতী।
১৯৭০ সাল পর্যন্ত যুগীদের রাত্রিকালীন পর্যটন অব্যাহত ছিল।ঐ সময় নকশাল আন্দোলন চলা কালে এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়।যুগীদের মধ্যে কিছু সান্ধ্য ভাষার,অপরের কাছে অবোধ্য,প্রচলন আছে।যুগীরা রাত্রিকালীন ভিক্ষা পর্যটনে কতক গুলি যে শিব দোহা গান করেন,তার কয়েকটি নমুনা নিম্নরূপ—

১। ভোলা মহাদেব মহেশ্বর
হলদি চন্দন পরকে দেই
ঘুরি হইথিবে পাউঁশ।
দানীকে দানী ছোপি কাঁহা
চন্দ্র সূর্য বাদল ছাই
আর যোগী মাঙনে আই
ব্যোম হর হর শিবদুর্গা।
২।খেল খেল কাতি
খেল খেল কাতি
কুয়া নেই গেলা কাজলপাতি
সত্যিকে ডম্বরু পুহিব রাতি
ব্যোম হর হর শিবদুর্গা।
৩। ডাহনি মার ডাহনি মার
ডাহনি করিছি মঁগলবার
মহাদেব বলে ক্ষেত্রপাল
ডাহনি মুড়ে নিয়া জ্বলে
ব্যোম হর হর শিবদুর্গা।
৪। চেত চেত ডাহনি মুড়ে
নাচিলা খাঁড়িয়া ভুত।
টুঁ টুঁ নটিয়া শাগ
দাতাকু ছাড়ি অপাকু নাগ
রণসরিষা বজ্র মুঠি
ডাহনি খাইলা উপরে উঠি
ব্যোম হর হর শিবদুর্গা।

Abhirup Maity

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অভিরূপ মাইতি একজন প্রতিশ্রুতিবান সংবাদকর্মী। খবরের অন্তরালে থাকা সত্য অনুসন্ধান এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করাই তার লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় টিমের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

Home Breaking E - Paper Video Join