TRENDS

মুকুট নিয়েই চলে গেলেন সোমেন, মধ্য রাতেই মোবাইলে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়ল খবর, ছোড়দা নেই

Chandramani Saha

নিজস্ব সংবাদদাতা: মুকুট নিয়েই চলে গেলেন সোমেন মিত্র, কংগ্রেসের ছোড়দা! কংগ্রেসে যদি কারও নামের পেছনে ‘দা’ বা দাদা কথাটা সেঁটে যায় তবে বুঝতে হবে তিনি কংগ্রেস কর্মীদের হৃদয়ের মনি হয়ে রয়ে গেছেন। এআইসিসির ওয়ার্কিং কমিটি তাঁকে মানুক না মানুক তিনি বঙ্গ কংগ্রেসের নেতা। যেমন মানুদা, বরকতদা, প্রিয়দা, ছোড়দা এবং এই সময়ে অবশ্যই অধীরদা। কেন এই ভালোবাসা কংগ্রেস কর্মীদের তাঁর প্রতি? কারন স্বাধীন কন্ঠস্বর, কারন নিজের ভুলকে ভুল বলে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা।

১৯৯৮সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হচ্ছে তাঁরই আমলে। কংগ্রেস দুর্বল হয়েছে কিন্তু তিনি মমতা ব্যানার্জীকে প্রজ্ঞাবতী মানতে রাজি হননি। ১০বছর পরে মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে জোটে যাচ্ছেন কংগ্রেসকে ছেড়ে অন্যদল গঠন করে। ২০০৯য়ে তৃণমূলের সমর্থনে ডায়মন্ড হারবার থেকে সাংসদ কিন্তু ২০১৪ সালে তিনি বুঝলেন, মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে কাজ করতে পারবেননা। সাংসদ পদ ছেড়ে দিলেন, ফিরে এলেন কংগ্রেসে। তৃণমূলের নেতারা সোমেন দা বলে ডাকতেন, কংগ্রেসে এসে ফের ছোড়দা হলেন। বুধবার গভীর রাতে সেই মুকুট নিয়েই চলে গেলেন সোমেন মিত্র।

২১শে জুলাই থেকে ২৯শে জুলাই ৯দিনের লড়াই! মাঝখানে হঠাৎই খবর ছড়িয়ে পড়েছিল তিনি সঙ্কটে কিন্তু ছেলে রোহন জানিয়ে ছিলেন, ওটা গুজব! বাবা ভাল আছেন। আশ্বস্ত হয়েছিলেন কংগ্রেস কর্মীরা, আশ্বস্ত হয়েছিল বাংলার স্থিত, ধৈর্য্যবান রাজনীতিকরা। কিন্তু ২৯শে জুলাই মধ্য রাতের পর রোহনই প্রথম জানিয়ে দিলেন, ‘বাবা আর নেই। আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তিনি।’ এরপর মধ্য রাতেই মোবাইলে মোবাইলে আবদুস সাত্তার, আমজাদ আলি, শুভঙ্কর সরকার থেকে শুরু করে ছোট বড় সমস্ত নেতার কানেই আছড়ে পড়েছে আর্তনাদ, ‘ছোড়দা নেই, ছোড়দা নেই, ছোড়দা নেই….।”

৭৮ বছর বয়সে নিভে গেলেন আরও একজন কংগ্রেস রত্ন। প্রিয় রঞ্জন দাসমুন্সির প্রয়ানের পর ঠিক এমনটাই বলেছিলেন সোমেন মিত্র, কংগ্রেস রত্ন! কিডনি ও হৃদযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। দু’দিন আগেও তাঁর ডায়ালিসিস হয়।  বুধবার রাত দেড়টা নাগাদ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর স্ত্রী ও ছেলে আছেন। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি তথা সাংসদ রাহুল গান্ধী।

রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় আইসিইউতে স্থানান্তর করতে হয় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতিকে। জ্বর-সর্দি থাকায় করোনা পরীক্ষাও করা হয় তাঁর। যদিও সেই রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। এরই মাঝে শনিবার জানা যায় যে, সোমেন মিত্রর অবস্থার অবনতি হয়েছে। কাজ করছে না তাঁর কিডনি। হৃদস্পন্দনের মাত্রাও কমে গিয়েছে। তা ছাড়াও একাধিক সমস্যা ছিল বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতার। দীর্ঘদিন ধরেই হৃদযন্ত্রে সমস্যা ছিল সোমেনবাবুর। চিকিৎসা করাতেন দিল্লির এইমস হাসপাতালে। গত ২১ তারিখ আচমকাই অসুস্থ হন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে।
গনিখান চৌধুরীর শিষ্য বলেই পরিচিত সোমেন মিত্রর জন্ম ১৯৪১ সালের ৩১ ডিসেম্বর। অধুনা বাংলাদেশের যশোহর জেলায়। ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শিয়ালদহ কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন। কংগ্রেসের অতি দুর্দিনেও তিনি দল ছাড়েননি। তবে ২০০৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজস্ব দল তৈরি করেন। নাম দেন প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেস।

২০০৯ সালে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনার পরে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। সেই বছরই লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্র থেকে সিপিএমের শমীক লাহিড়ীকে হারিয়ে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন সোমেনবাবু। ২০১৪ সালে তিনি অবশ্য সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন। ফিরে যান তাঁর পুরনো দল জাতীয় কংগ্রেসে। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় বারের জন্য তিনি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হন। আমৃত্যু সেই পদেই ছিলেন সোমেন মিত্র।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join