TRENDS

ক্রান্তিকালের মনীষা-২৬, স্বামী বিবেকানন্দ: বিনোদ মন্ডল

Chandramani Saha

আত্মার আত্মীয় স্বামী বিবেকানন্দ                                                                                       বিনোদ মন্ডলক্রান্তিকালের মনীষা-২৬, স্বামী বিবেকানন্দ: বিনোদ মন্ডল

আজকাল রোজই দেখি যেকোন ছুতোয় যে মহামনীষীগণকে নিয়ে অনবরত দড়ি টানাটানি চলে– রাজনীতির বৃত্তে– তাঁদের অন্যতম স্বামী বিবেকানন্দ। এমন ঘটনা ঘটে রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্রকে নিয়েও। আমরা সাধারণ মানুষ, অসংখ্য দলিল-দস্তাবেজ নথিপত্রের অতল সাগরে ডুব দিয়ে রত্নসন্ধানী হতে পারি না। অগত্যা মিডিয়া-মদ্য গন্ডুষে পান করে তৃষ্ণা মেটাই।

টিভির টকশোগুলোতে কুস্তির ঢঙে প্রমাণ করার চেষ্টা চলে স্বামীজী আমাদের লোক‌। বেঁচে থাকলে আমাদের পার্টির আজীবন উপদেষ্টা থাকতেন। অথচ এই বিবেকানন্দ ১৮৯৪ সালে আমেরিকা থেকে তাঁর অনুগামী সন্ন্যাসী বন্ধুদের চিঠি লিখে সতর্ক করে দিচ্ছেন– “আমি একজন রাজনীতিক নই, অথবা রাজনৈতিক আন্দোলনকারীও নই। …. যেন আমার কোনও লেখা ও কথার ভেতরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মিথ্যা করে আরোপিত না করা হয়।” শ্রী রামকৃষ্ণদেবের বহুশ্রুত সুভাষণ মনে পড়ে যায়– ‘মিশরির রুটি সিদে করে খাও, আর আড় করে খাও, মিষ্টি লাগবে।’ স্বভাবতই স্বার্থান্বেষী সুযোগসন্ধানীরা এই সাধুকে নিয়ে ভন্ডামীর ভান্ডারা চালিয়ে যায়। যে যার দিকে যত পারে ঝোল টানে।

বিবেকানন্দ হঠাৎ একদিনে পাবলিক ফিগার হয়ে যাননি। এটা ঠিক, চিকাগো বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলন (১৮৯৩) তাঁকে জগদ্বিখ্যাত হতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু তার আগে তিনি অনেক অভিঘাত পার হয়ে এসেছেন। বি এ পাস করার পর আইন পড়তে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে বিতর্ক সভায় বা ব্রাহ্ম অধিবেশনে তাঁর যুক্তি জাল এবং সুর জাদুতে কলকাতায় ছাপ ফেলতে শুরু করেছেন। মেট্রো পলিটন স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ছাত্র নরেনের বক্তব্য বুঁদ হয়ে শুনেছেন তৎকালীন নব্য বঙ্গ সমাজের নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন ওই সভার সভাপতিও। ভবিষ্যতে এক বড় বাগ্মী হবেন, নরেন্দ্রনাথ দত্ত; জনসমক্ষে এই অভিমত প্রকাশ করেছিলেন তিনি।আর ওস্তাদ আমির খাঁ এবং পন্ডিত বেণী গুপ্ত তাঁকে সংগীতে তালিম দিতে তাঁরই বাড়িতে নিয়মিত আসতেন। এ ব্যবস্থা করেছিলেন পিতা বিশ্বনাথ দত্ত।

সম্পর্কে জ্ঞাতি দাদা রামচন্দ্র দত্ত নিয়মিত দক্ষিণেশ্বরে যেতেন। তখন তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ ছেড়ে জেনারেল অ্যাসেম্বলি কলেজে পড়ছেন। সেখানে প্রথম সাক্ষাতের দিনে পরিবেশন করেছিলেন” মন চল নিজ নিকেতনে। সংসার বিদেশে বিদেশীর বেশে ভ্রম কেন অকারণে। ” যে গানে বিভোর হয়ে ঠাকুর সমাধিস্থ হন।

আইন পড়ার সময় যখন পিতৃবিয়োগ হলো, অকূল পাথারে পড়লেন। হৃদরোগে ইহলোক ত্যাগ করে যাওয়ার পর হঠাৎ জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে গেল বিশ্বনাথ দত্ত যা রোজগার করেছেন, সবই খরচ করে গেছেন। জমার ঘরে শূন্য। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত এসে হাজির এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়। যিনি আবার তাঁদের বসতবাড়িতে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে হাইকোর্টে মামলা রুজু করেন। পরে হেরেও যান। কিন্তু দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই শুরু হলো নরেনের। এই সময়ে ঠাকুরের কাছে গিয়ে কাতর নরেন বলেন– ‘মহাশয়, আমার ভাইবোনগুলো না খাইতে পাইয়া মরিতে বসিয়াছে, আপনি একটি উপায় করিয়া দিন।’ ঠাকুর কালী মন্দিরে মায়ের কাছে প্রার্থনার কথা বলেছিলেন। পরে কী হলো জানতে চান রামকৃষ্ণ । উত্তরে নরেন বলেন — আমি জগৎ মাতার নিকট সামান্য অর্থ চাইতে পারলাম না, বিবেক বৈরাগ্যের জন্য প্রার্থনা করিয়াছি। বোঝা যায়, স্বজনপোষণের জন্য এই মানুষটি জগতে আসেননি।

ভারতাত্মার আবিষ্কারে নগ্নপদে সারা ভারত ভ্রমণ করেছেন তিনি। ১৮৮০ নাগাদ পিতার সঙ্গে ভ্রমণের সামান্য অভিজ্ঞতা ছিল। এবার একলা পথিক যেন। ভাঙ্গীর দেওয়া হুঁকোয় তামাক খেলেন। রাজার দেওয়া চুরুটে দিলেন টান। সমান মর্যাদায় দুজনকে দেখলেন। রামকৃষ্ণের প্রয়াণের পর বরানগরের মঠে চরম দারিদ্র্যে দিন কেটেছে। স্বামীজি শিষ্যকে বলেছেন — ‘এক-এক দিন মঠে এমন অভাব হয়েছে যে, কিছু নেই। ভিক্ষা করে চাল আনা হলো তো নুন নাই। একেকদিন শুধু নুন ভাত চলেছে, তবু কারো ভ্রুক্ষেপ নাই; জপ-ধ্যানের প্রবলতোড়ে আমরা তখন সব ভাসছি। তেলাকুচা পাতা সেদ্ধ, নুন ভাত এই নানাবিধ চলছে….. এখনকার ছেলেরা ততো কঠোর জীবন যাপন করতে পারবে না।তাই একটু থাকবার জায়গা ও এক মুঠো অন্নের বন্দোবস্ত করা মোটা ভাত কাপড় পেলে ছেলেগুলো সাধন-ভজনে মন দেবে ও জীবহিত কল্পে জীবনপাত করতে শিখবে।

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা ভ্রমণ পথের নানা অভিজ্ঞতা নানা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। যা সুলভ এবং সুখপাঠ্য। সবচেয়ে বড় কথা অনুভববেদ্য ও শিক্ষণীয়। কাশী, বৃন্দাবন, সারনাথ, বুদ্ধগয়া, অযোধ্যা, প্রয়াগ, মাদ্রাজ, বোম্বাই, পন্ডিচেরি, ঋষিকেশ সর্বত্র প্রায়। অবশেষে কন্যাকুমারিকার শিলাখণ্ডে বসে তিনদিন তিনরাত অনাহারে ধ্যানে কাটান। বলা হয় এখানেই তিনি মার্গ দর্শনলাভ করেন।

পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রার লক্ষ্য অনুভূত হয় মনে। শ্রীলংকা, জাপান, কানাডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা করেন। ইংল্যান্ড সহ নানা দেশে ভ্রমণ করেন। ধর্ম ও বেদান্ত নিয়ে বক্তৃতা করেন। পাশাপাশি ইংরেজিতে নানা আর্টিকেল লিখে চলেন।

দূরদর্শী মানুষটি তখনই বুঝে ছিলেন, তাঁর বক্তব্য ও লেখার ওপর সরকারের নজরদারি জারি আছে। ১৮৯৭ সালের নভেম্বরে লাহোর থেকে স্বামী ব্রহ্মানন্দ কে চিঠিতে জানাচ্ছেন — ”আমার দুইখানি বিলাতি চিঠি কে রাস্তায় খুলিয়াছে। অতএব আমার চিঠিপত্র এক্ষণে আর পাঠাবে না।’ অর্থাৎ তিনি সেই সময় উপলব্ধি করেছিলেন,তাঁর কোনও বক্তৃতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে বিশ্বময় স্বাধীনভাবে কাজ করবার যে মিশন তিনি নিয়েছেন তা ব্যাহত হবে।

জাতীয় কংগ্রেসের প্রাথমিক পর্বে কলকাতাতে কাটিয়েছেন তিনি। ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াত করেছেন। সমসাময়িক রাজনীতিকদের রীতি নীতি সমর্থন করতে পারেননি। খেদ ঝরে পড়েছে — ‘হে ভারত, এই পরানুবাদ, পরানুকরণ, পরমুখাপেক্ষা, এই দাসসুলভ দুর্বলতা, এই ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতা – এইমাত্র সম্বলে তুমি অধিকার লাভ করিবে? এই লজ্জাকর কাপুরুষতার সহায় তুমি বীরভোগ্যা – স্বাধীনতা লাভ করিবে? উপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের চরিত্র তিনি জানতেন। নানাভাবে তীব্র সমালোচনাও করেছেন। পরিষ্কার বলেছেন — ‘রক্তশোষণই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের মূল উদ্দেশ্য।’

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, শিক্ষার অধিকার স‌ংকোচন, সংবাদপত্রের মৌলিক স্বাধীনতা হরণ,কালাকানুন বানিয়ে শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থে কুঠারাঘাত শুধু একালে নয়, সেকালেও সমান প্রচলিত ছিল। স্বামীজীর ভাষায় – ”ধর, এই চিঠিখানা এই যদি তুমি প্রকাশ করে দাও, ভারতের নতুন কানুনের জোরে ইংরেজ সরকার আমাকে এখান থেকে (আমেরিকা) সোজা ভারতে টেনে নিয়ে যাবে এবং বিনা বিচারে আমাকে হত্যা করবে।” তাই তিনি জনগণের মধ্যে অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অশিক্ষা ও দারিদ্র্য দূরীকরণকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন — “যতদিন না ভারতের সর্বসাধারণ উত্তমরূপে শিক্ষিত হইতেছে, উত্তমরূপে খাইতে পাইতেছে …. ততদিন যতই রাজনৈতিক আন্দোলন করা হোক না কেন, কিছুতেই কিছু হইবে না।”

বাংলার পাড়ায় পাড়ায় এখন ভোট পাখিদের পাখশাট চলছে। গ্রাম নগরে চলছে শ্রী রাম মন্দিরের জন্য অর্থ সংগ্রহ অভিযান। মহা প্রয়াণের পূর্বে ঢাকা শহরে দাঁড়িয়ে স্বামীজি বলেছেন – ‘আগামী পঞ্চাশ বছর আমাদের গরীয়সী ভারতমাতা আমাদের আরাধ্য দেবতা হোন। অন্যান্য অকেজো দেবতাদের এই কয়েক বছর ভুললে কোনও ক্ষতি নেই। তাঁরা এখন ঘুমোচ্ছেন।’ আজ যখন আখের গোছানোর জন্য ধুম লেগেছে হৃদ কমলে, তখন বিবেক বাণী স্মর্তব্য: ‘মানুষের জন্য কাজ করে তোরা শেষ হয়ে যা, এটাই আমার আশীর্বাদ।’ তাঁর চেতনায় যে প্রবুদ্ধ ভারতের ছবি ছিল- সেই ভারতের ‘বৈদান্তিক মস্তিষ্ক’ এবং ‘ইসলামিক দেহ’ কল্পনা করেছিলেন তিনি। অথচ আজ ভারত প্রতিদিন পলে পলে তার বহুত্ববাদী চরিত্র হারিয়ে ফেলছে।

অপুষ্টিতে, রোগভোগে শরীর নষ্ট হচ্ছিল ক্রমাগত। তিনি মুখেই প্রায়শ শিষ্যদের সাথে রসিকতা করতেন- “আমি পূর্ণ চল্লিশ বৎসর বাঁচিব না।” বাস্তবে উনচল্লিশ বৎসর, পাঁচ মাস, চল্লিশ দিন পার্থিব পরিক্রমণ ছিল তাঁর (১২/১/১৮৬৩–১৪/৭/১৯০২)। সমাপতন হল, চারবছর আগে ১৮৯৮-এর এই একই ৪ জুলাই তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, স্বাধীনতা স্মরণে একটি অনবদ্য কবিতা লেখেন তিনি–‘টু দ্য ফোর্‌থ অফ জুলাই’। ব্রহ্মচারী পূর্ণ চৈতন্য যার বঙ্গানুবাদ করেছেন ‘মুক্তি’ শিরোনামে।

আমাদের আত্মার আত্মীয় বিবেকানন্দ যে মার্গ প্রদর্শন করে গেছেন, তা নিয়ে ছুঁৎমার্গের কলরব প্রায় কলহ পর্যায়ে চলে যায়। বিবেক বাণী উপলব্ধির যোগ্যতা যেদিন ভারতের মানুষ প্রকৃত অর্থে অর্জন করতে সমর্থ হবে, সেদিন তাঁর চলার পথও সর্বজনীন হিতের সরনি ধরবে। স্বামীজীর ভাষ্যে বলা যায়- ‘শক্তি ও সাহসিকতাই ধর্ম। দুর্বলতা ও কাপুরুষতাই পাপ। অপরকে ভালোবাসাই ধর্ম। অপরকে ঘৃণা করাই পাপ।‘

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join