TRENDS

এবার করোনার বলি মেদিনীপুরের প্রধান শিক্ষক! লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়েও ফেরাতে পারলনা নার্সিংহোম, চলে গেলেন কেশপুরের প্রিয় শিক্ষক

Chandramani Saha

নিজস্ব সংবাদদাতা: “আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে বল। আমি ভালো নেই, কোনও চিকিৎসাই হচ্ছেনা এখানে।” দিন সাতেক নার্সিং হোমে ভর্তি থাকার পর বলেছিলেন একজন পরিচিতকে। সেই পরিচিত যোগাযোগ করেন মাস্টারমশাইয়ের বাড়ির সাথে। বাড়ির লোকেরা ছুটে আসেন নার্সিংহোমে কিন্তু নার্সিংহোম বলে, সবই ঠিকঠাক হচ্ছে চিন্তা করবেননা। চিন্তা করেনি বাড়ির লোক। মেদিনীপুর শহরের প্রতিষ্ঠিত নার্সিংহোম, দিনে ১৫ থেকে ২০হাজার টাকা শয্যাবাবদ খরচা! কিন্তু ভালো হননি মাস্টারমশাই। কয়েক লাখ টাকা গচ্চার বিনিময়ে মৃত্যু। বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যু হয়েছে কেশপুরের মুগবসান হক্কানিয়া হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক অসিত বরণ জানার। ডেবরা ব্লকের পাটনার সন্তান অসিত বাবুর বর্তমান ঠিকানা ছিল মেদিনীপুর শহরের পালবাড়ি। স্ত্রীও ওই স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন।

একের পর এক শিক্ষকের মৃত্যু গুনছে মেদিনীপুর শহর কিন্তু একজন প্রধান শিক্ষকের মৃত্যু এই প্রথম। তাঁর মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছেন কেশপুরের অগণিত ছাত্রছাত্রীরা। ফেসবুক আর সোশ্যাল মিডিয়া ঘাঁটলে শুধুই সেই হাহাকারের ছবি। সদা হাস‍্যময় মানুষটি অবসর নিতেন ২০২২ এর গোড়ায়, তাঁর আগেই চলে গেলেন? আর চলে গেলেন বেশকিছু প্রশ্ন রেখে। প্রশ্নটা হল, সরকারি হাসপাতালকে ধুরছাই করছ কর কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে ঠিক ঠাক চিকিৎসা হচ্ছে তো?

১লা মে অসুস্থতা বোধ করেন অসিতবাবু। চিকিৎসকের নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন পরিবারের সদস্যদের থেকে। তারপর করোনা পজিটিভ এবং সাথে সাথেই বেসরকারি হাসপাতালে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন কম ছিল বলে সেই যে অক্সিজেনের নল লেগেছিল আর খোলেনি। ১৫দিন চিকিৎসার পর মৃত্যুর আগে ধরা পড়ল লাংসে ইনফেকশন, মাথা কাজ করছেনা, স্ট্রোক, আইসিইউ এবং মৃত্যু! তা’হলে এতদিন হচ্ছিল কী? সুগার ছিল। তো? সুগার থাকলেই সবাই করোনায় মারা যায়? যদি তাই হয় তবে সুগার পেশেন্টকে ভর্তি না নিয়ে বলে দিলেই তো ফুরিয়ে যায় যে সুগার আছে বাঁচবেনা! তাহলে মাস্টারমশাই যে বলেছিলেন, “এখানে এরা কিছুই করছেনা, আমি ভালো হাছিনা। আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাও।” ভুল তো কিছু বলেননি।

না, শুধু মেদিনীপুর শহর নয় এই একই প্রশ্ন অন্যত্রও। ‘এখনই তো কামানোর সময়’ এই মন্ত্রেই এখন চলছে অনেক নার্সিংহোম, বেসরকারি হাসপাতালই। দিনকয়েক আগেই মৃত্যু হয়েছে ডেবরার এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মনোরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের। করোনা ধরা পড়ার পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পূর্ব মেদিনীপুরের বিখ্যাত বেসরকারি হাসপাতালে। বাড়ির লোকেরা জানিয়েছিলেন, শালবনী করোনা হাসপাতালে নিয়ে যাইনি কারন বাবার সুগার ছিল। ভাবলাম শালবনীতে শুধু করোনার চিকিৎসা হয় কিন্তু এখানে স্পেশালিস্ট হাসপাতাল, সুগার আছে বলে আলাদা কেয়ার নেবে। কিন্তু জানা গেল ৫০০ বেশি সুগার থাকা সেই মাস্টারমশাইকে পায়েস, দুধ চিনির চা দেওয়া হচ্ছে। মাস্টারমশাইয়ের এক পরিচিত ব্যক্তি যিনি নিজেও একজন শিক্ষক তিনি অবাক হয়ে যান যখন মনোরঞ্জনবাবু তাঁকে জানান পায়েস আর দুধ চিনির চা দেওয়া হচ্ছে বলে। মাষ্টারমশাই বলেন, “আমি ওনাকে বলেছিলাম স্যার ওরা দিচ্ছে দিক, আপনি খাবেননা।”

কোভিড পেশেন্ট! বাড়ির লোক পাশে নেই, কী হচ্ছে জানা নেই। চারদিনের মাথায় মারা গেলেন মনোরঞ্জনবাবু। বৃহস্পতিবার মৃত্যু হল প্রধানশিক্ষক অসিত বরণ জানার। মেদিনীপুর শহরের পালবাড়ির বাসিন্দা অসিত বাবুর মৃত্যুর আগের দিন মেদিনীপুর শহরের অন্য একটি নার্সিংহোমে মৃত্যু হল অরবিন্দনগরের বাসিন্দা ডেবরার স্কুল শিক্ষক স্বপন ভূঁইয়া। করোনা মুক্ত হয়ে ফেরার পর প্রায় ১০দিন নার্সিংহোমে থাকার পর মৃত্যু! প্রশ্ন হচ্ছে যে পরিমান টাকা নেওয়া হচ্ছে সেই গুনমানের চিকিৎসা হচ্ছে তো? কয়েকদিন আগেই প্রশ্নটা খোদ তুলেছিলেন অসিতবাবুই। সরাসরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, ‘অনেক বেশি টাকা নিচ্ছেন আপনারা।’ “এই নিয়ে স্যারের সঙ্গে এক প্রস্ত ঝগড়া হয়ে গেছিল।বাড়ির লোক অবশ্য এবারেও পাত্তা দেয়নি।” জানালেন অসিতবাবুর সেই ঘনিষ্ঠ মানুষটি। বললেন, ‘ আসলে শিক্ষক মানুষ তো! যাওয়ার আগে জানিয়ে গেলেন যে করোনায় মৃত্যু তো হচ্ছেই কিন্তু বাঁচার তাগিদে আমরা টাকা দিয়ে সেই মৃত্যুকেই কিনছি কী?”

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join