TRENDS

আতঙ্কের প্রহর গোনা শেষ হলদিয়ার ! বি.সি.রায়ের হাত ধরে চালু হয়ে গেল কোভিড হাসপাতাল

Chandramani Saha

আতঙ্কের প্রহর গোনা শেষ হলদিয়ার ! বি.সি.রায়ের হাত ধরে চালু হয়ে গেল কোভিড হাসপাতালনিজস্ব সংবাদদাতা: দু’দশক আগের আনন্দাশ্রু যেন ফিরে এল হলদিয়ার বুকে। ২০০১ সালে হলদিয়া পেট্রোক্যামকে  ঘিরে মানুষ দেখেছিলেন রুটিরুজির স্বপ্ন আর ২০২১, অতিমারি করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হলদিয়াবাসীর পাশে এসে দাঁড়ালো বি.সি.রায় হাসপাতাল! তাই এই আনন্দাশ্রু যা ফের একবার ফিরে এল বুধবার, হলদি নদীর পাড়ে বি.সি.রায় হাসপাতালকে ঘিরে। গত ১৫মাস ধরে আতঙ্কে দিন কাটিয়েছে হলদিয়া আর তার সংলগ্ন এলাকা। আতঙ্ক মৃত্যু আর করোনার, আতঙ্ক করোনা হলে স্রেফ বিনা চিকিৎসায় মরে যাওয়ার, যেমন করোনার প্রথম এবং দ্বিতীয় ঢেউয়ে একের পর এক মৃত্যু গুনে গেছে শিল্প শহর। হলদিয়া থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার চণ্ডীপুর, ৮০কিলোমিটার পাঁশকুড়া। ওই পথ যেতেই যেতেই মৃত্যু হয়েছে কতজনের! সেই আতঙ্কের অবসান হল।

আতঙ্কের প্রহর গোনা শেষ হলদিয়ার ! বি.সি.রায়ের হাত ধরে চালু হয়ে গেল কোভিড হাসপাতালবুধবার বিসিরায় হাসপাতালের ২৯০শয্যা বিশিষ্ট কোভিড ওয়ার্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে এমনটাই জানালেন হলদিয়া পুরসভার চেয়ারম্যান সুধাংশু শেখর মন্ডল।
মন্ডল জানিয়েছেন, ” চরম দুশ্চিন্তায় দিন কেটেছে হলদিয়াবাসীর। বি.সি.রায় হাসপাতালে উপযুক্ত পরিকাঠামো থাকায় এখানে ভেন্টিলেশন ও আইসিইউ যুক্ত কোভিড ওয়ার্ড চালুর জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আগেই আবেদন করেছিলাম। আশঙ্কাজনক অবস্থায় করোনা রোগীদের হলদিয়া থেকে পাঁশকুড়া পাঠানোর পথে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে।

আতঙ্কের প্রহর গোনা শেষ হলদিয়ার ! বি.সি.রায়ের হাত ধরে চালু হয়ে গেল কোভিড হাসপাতালকোভিড হাসপাতালের উদ্বোধন করতে এসে পশ্চিমবাংলার প্রথম এই বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ বি.সি.রায় মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের রূপকার, প্রাক্তন সাংসদ লক্ষণ শেঠ জানান, ” আপাতত ২৯০ শয্যা দিয়ে আমরা এই কোভিড পরিষেবা চালু করছি কিন্ত পরিস্থিতির তাগিদে এই শয্যা অল্প সময়ের মধ্যেই ৪৯০ থেকে ৫০০ শয্যায় নিয়ে যাওয়ার মত প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের। রাজ্য সরকার আমাদের অনুমোদনের পাশাপাশি বেশকিছু সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করায় এই পরিষেবা চালু করতে পেরেছি আমরা।”

আতঙ্কের প্রহর গোনা শেষ হলদিয়ার ! বি.সি.রায়ের হাত ধরে চালু হয়ে গেল কোভিড হাসপাতালবি.সি.রায় হাসপাতালের অন্যতম কর্মকর্তা আশিস লাহিড়ী জানিয়েছেন, ‘ এখন আমরা ৬টা এইচডিইউ, ১৬টি আইসিইউ, ২৮টি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত শয্যা রয়েছে। এছাড়া ৭টি ভেন্টিলেটর শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাকি সাধারণ শয্যা রয়েছে। এই সমস্ত শয্যাই থাকছে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন পরিষেবায় সংযুক্ত। হাসপাতালের মধ্যে থাকা অক্সিজেন প্ল্যান্টের মাধ্যমেই রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহ করা হবে। আমাদের হাইপো অক্সিমিটারও রয়েছে ফলে কোভিডের সব রকমের চিকিৎসা এখানে হবে।’
লাহিড়ী আরও পরিস্কার করে দিয়েছেন যে, “রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ধারকরাও এখানে কোভিড চিকিৎসার সুবিধা নিতে পারবেন। কোনও রোগীকেই আমরা ফেরাবো না এই নীতি নিয়েই আমরা করোনা চিকিৎসা পরিষেবা দেব।”

কোভিড হাসপাতাল শুরু হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়েছেন শিল্পসংস্থাগুলির কর্তারাও। হলদিয়ার বন্দর ও শিল্পাঞ্চলে একটি উন্নতমানের করোনা হাসপাতাল না থাকায় তীব্র আশঙ্কায় ছিলেন তাঁরাও। তাদের পক্ষ থেকেও বারবার প্রশাসনের কাছে নানাভাবে বার্তা পাঠানো হয়েছিল হলদিয়াতে একটি উন্নত কোভিড হাসপাতাল করার জন্য। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের তরফেও রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরকে আর্তি জানানো হয়। যেহেতু সরকারের নিজস্ব কোনও পরিকাঠামো ছিলনা তাই বি.সি.রায়কেই একবার বেছে নেওয়া হয়েছিল কোভিড হাসপাতালের জন্য কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাতকারনে সেই প্রক্রিয়া বাধা প্রাপ্ত হয়েছে বারংবার। নির্বাচনের পর নতুন করে সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই বাধা কাটল।

শিল্প সংস্থাগুলির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের মুখে একটা বড় মনোবল পাওয়া গেল এই হাসপাতালকে ঘিরে। দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে গেল আমাদের। এই সময়ে দাঁড়িয়ে যখন অতিমারির আরও প্রবল হতে পারে তৃতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায়। তখন হলদিয়ায় এই করোনা হাসপাতাল চালুকে আমি ২০বছর আগের পেট্রোক্যাম চালুর মতই উল্লেখ যোগ্য ঘটনা বলে মনে করি। সেদিন পেট্রোক্যামের হাতধরে হলদিয়া ও তার আশেপাশের মানুষেরা দুবেলা পেটভরে খাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন আজ এই করোনা হাসপাতাল তাঁদের অতিমারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহস জোগাবে।”

উল্লেখ্য হলদিয়া শিল্পাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকার পাশাপাশি মহিষাদলকে যুক্ত করলে প্রায় ৮লক্ষ মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠল এই করোনা হাসপাতালটি। দ্বিতীয় ঢেউয়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় সর্বাধিক আক্রান্ত হয়েছে এই হলদিয়া এলাকাই। গত ফেব্রুয়ারিকে যদি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর মাস ধরা হয় তবে সেই সময় থেকে এখনও অবধি অর্থাৎ ৪মাসে শুধুমাত্র হলদিয়া পৌর এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৪০০জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩৪জনের। নিশ্চিতভাবেই এই মৃত্যুর সিংহভাগই ঠেকানো যেত যদি এরকম একটি হাসপাতাল থাকত। স্বাভাবিক ভাবেই করোনা হাসপাতাল চালু হওয়ায় স্বস্তিতে হলদিয়া ও তার আশেপাশের বাসিন্দারা।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join