TRENDS

কথা রাখল মেয়ে, নিজে মরে পরিবারকে দিয়ে গেল ১লক্ষ টাকার প্যাকেজ

Chandramani Saha

নিজস্ব সংবাদদাতা: বাবা মায়ের সংসারে সুরাহা হতে চেয়েছিল তাই রান্না বাটি খেলার বয়সে ১৫০ কিলোমিটার দুরে কাজে গিয়েছিল লঙ্কার বাগানে। কি করবে? যে সংসারে রান্নার হাঁড়ি চড়েনা সে সংসারে রান্না বাটি খেলার বিলাসিতাও মানায় না। তো মেয়ে চলল, বাবা মার হাতে দুটো টাকা গুঁজে দেওয়ার আশায়! দু মুঠো গরম ভাতের বেয়াড়া স্বপ্নও বলা যেতে পারে। ছোট্ট সেই মেয়েটার বয়স মেরেকেটে বারো কি তের।বাড়ি ছত্তিশগড়ের বিজপুর জেলায়। কিন্তু পেটের খিদে তো বয়স হিসেব করে হয়না। যে পেটের টানে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া, বাড়ি ফিরল সেই খালি পেটেই।

জামলো মকদম। পরিযায়ী শিশুশ্রমিক। দু’মাস আগে অভাবের সংসার ছেড়ে, তেলঙ্গানার কান্নাইগুডা গ্রামে লঙ্কার বাগানে কাজ করতে গিয়েছিল সে। স্বপ্ন ছিল, রোজগারের টাকায় বাবা-মাকে কিছুটা সাহায্য করবে। কিন্তু হঠাৎ লকডাউন আরও কয়েক লক্ষ মানুষের মত ছোট্ট জামলোর জীবনও ওলট পালট করে দিল। তেলেঙ্গানার থেকে ফিরতে চাইছিল জামলোর সাথে সাথে আরো অনেকেই । আতঙ্ককে সঙ্গী করেই প্রথম দফার লকডাউনের মধ্যে তেলঙ্গানার গ্রামেই অপেক্ষা করছিল জামলো। কিন্তু লকডাউনের মেয়াদ বাড়তেই বাড়িতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয় ছোট্ট জামলো।সঙ্গী হয় আরও ১১ জন পরিযায়ী শ্রমিকের একটি দল। তেলঙ্গানা থেকে বিজাপুর, প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পথ। লকডাউনের কারনে বাস ট্রেন সব বন্ধ। এতটা পথ তারা যাবে কী ভাবে? দল বেঁধে হাইওয়ে দিয়ে হেঁটে গেলেও পুলিশ আটকাবে। অগত্যা জঙ্গলের নির্জন রাস্তাই বেছে নেওয়াই ভালো বুঝেছিলেন তাঁরা। ১৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল যাত্রা। চলতে চলতে কোথাও কোথাও রাস্তাও মেলেনি। এগোতে হয়েছে জঙ্গল কেটে।

এমনিতেই লকডাউন, তার মধ্যে জঙ্গলের পথে কোথায় মিলবে খাবার, জল বা অন্য বেঁচে থাকার রসদ অমিল। তবুও টানা তিন দিন ধরে হাঁটছিলেন সকলে। জামলোদের দলটি বিজাপুরের প্রায় কাছাকাছি চলেই এসেছিল। শনিবার, ১৮ এপ্রিল আশার আলো দেখলেন সবাই। জামলোর বাড়ি তখন মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে। ঘণ্টাখানেকের পথ। ঠিক তখনই পেটে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয় তার। যে রাজ্যে গ্রামে গঞ্জে হাসপাতাল নেই, সেখানে জঙ্গলের মধ্যে চিকিৎসার আশা করা বাতুলতা। মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় অনেক কষ্টে একটা অ্যাম্বুল্যান্স মিলেছিল। কিন্তু তত ক্ষণে এই ধকল সহ্য করতে না-পেরে মৃত্যু হয় বালিকার। অ্যাম্বুল্যান্সে করেই জামলোর ছোট্ট দেহ বিজাপুরের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

পরিযায়ী শ্রমিক জামলোর মৃত্যুর পরে নিয়ম অনুযায়ী তার করোনা-পরীক্ষা হয়েছে। রিপোর্ট নেগেটিভ।ছত্তিসগড় রাজ্যের বিজাপুর জেলার স্বাস্থ্যকর্তা বিআর পূজারী জানিয়েছেন, ‘‘ওই বালিকার শরীরে জলের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।’’ আর জামলোর বাবা আন্দোরাম মকদম জানিয়েছেন, তিন দিন ধরে হেঁটে বমি আর পেটের যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল মেয়ের। ওই দলে থাকা একজনের কথায়, ‘‘পথে খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল জামলো। তার পরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।’’
পরিযায়ী শিশু শ্রমিকের মৃত্যুতে জামলোর পরিবারকে এক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা শুনিয়েছে ছত্তিশগড় সরকার। অবশেষে মৃত্যুর পরও পরিবারের পাশে থাকার সেই কথা রাখল জামলো। ১লক্ষ টাকা ! গরীবের সংসারে অনেক, তাইনা ?

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join