মকদম – শুভময় দাস
আমার পাপ পুণ্যে আর প্রায়শ্চিত্তে বিশ্বাস আছে l যাঁর নেই পড়বেন না lজামলো মকদম l আমাদের সহনাগরিকা l বয়স বারোl বাড়ী ছত্রিশগড়l তেলেঙ্গানায় পরিযায়ী শ্রমিকl কাজ করে লঙ্কা ক্ষেতে l করোনার লকডাউন এর আতঙ্কে আরো বেশকিছু শ্রমিকের সঙ্গে দেশে ফিরবার জন্য দীর্ঘ 170 কিলোমিটার হাঁটতে থাকে l রাত দিনl ছোট ছোট পায়ে l সব বাধা টপকে l সরু রাস্তা ধরেl জঙ্গল কেটে কেটেl বাড়িতে উনুনে হাঁড়ি চড়েনি বহুদিন l অভাবের সংসারে বাড়িতেই ফিরতে চেয়েছিল মেয়েটা l জঙ্গলের রাস্তায় না মিলেছে খাবার নাম না মিলেছে জলl টানা চারদিন চার রাত হাঁটবার ক্লান্তিতে শেষে তীব্র পেটের যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে l মাওবাদী এলাকায় হয়তো একটা এম্বুলেন্স মিলেছিলl ততক্ষনে সমস্ত যুদ্ধ শেষ l এম্বুলেন্স ফিরল l তবে হাসপাতালে নয় – বাড়িতে l খালি হাতে নয় সরকারের দেওয়া এক লক্ষ টাকা নিয়ে ফিরল তার মৃতদেহl এ সমগ্র দেশের পাপl পাপ আমারও l এ শুধু প্রায়শ্চিত্তের কলমl
মকদম তোর নাম
বছর বারোর জামলো
হাঁটার জীবন শেষ
হেঁটেই জীবন থামলো ।
ছত্রিশগড়ে বাড়ি
হাঁড়িতে ফুটছে জল
চাল হীন জল শুধু
শব্দ অনর্গল ।
হাঁড়িতে হাঁড়িতে খিদে
ক্ষিদের কি দোষ ভাই?
জামলোর পেটে খিদে
কোথাও খাবার নাই ।
খিদের জ্বালায় শেষে
ছাড়লো নিজের বাড়ি
তেলেঙ্গানার পথে
উনুনে চড়বে হাঁড়ি ।
ও দেশে জুটলো কাজ
কি কাজ করিস তুই?
গতর বেচেই খাওয়া
অচেনা বিদেশ ভুঁই ।
বছর বারোর মেয়ে
লঙ্কা বাগানে কাজ
নিতান্ত রোগাসোগা
শরীরে ওঠেনি ভাঁজ ।
সকাল থেকেই কাজ
সূর্য ডুবলে থামে
ছোট্ট শরীর মাখে
ক্লান্তি এবং ঘামে l
সবজির ঝুড়ি ভরে –
বাগানে কোপায় মাটি –
লঙ্কার ক্ষেতে খাটে
সযত্নে পরিপাটি l
আমার তোমার মেয়ে
ইজেলে চোবায় রং !
কিংবা গাইছে গান
সিনেমা টা কিংকং
জামলো মেশায় রং
স্বপ্নে ই ভরে চোখ
বাড়িতে ফুটবে ভাত
উঠোন ভর্তি লোক ।
এভাবেই কেটে গেছে
দুই কি তিনটি মাস
জামলোর আয়ে ফোটে
খুশির বাগানে কাশ ।
এরই মাঝে একদিন
মিত্রো বললে “শোনো
ভাইরাস এসে গেছে
উপায় নাই তো কোনো ।
কাল থেকে সব্বার
থাকছেনা কাজ কোনো
লকডাউনের বাজার
কান খুলে সব শোনো ।
বাগানে যতেক শ্রমিক
সব্বারই মুখ ভার
কিভাবে পেরোবে তবে
এ ক্ষিদের পারাবার ।
বাড়িতে বাবা ও মা
কি খাবে ছোট্ট বোন?
কিভাবে পাঠাবে টাকা !
ভাবছে শিশুর মন ।
বাগানে শ্রমিক যত
সবাই বল্লে “শোনো
ফিরতেই হবে বাড়ি
উপায় নেইতো কোনো ।
সবাই আমরা শ্রমিক
এখানে খাবার কই?
মরতেই যদি হয়
দেশে ফিরে মরবই!!”
বন্ধ বাজার হাট
বন্ধ গাড়ির চাকা
চারদিক শুনশান
পকেট সবার ফাঁকা ।
পুলিশ দিচ্ছে টহল
বুটের শব্দ ভারী
সবাই বলছে “ভাই
লকডাউন দরকারি” ।
শুধুই মৃত্যু-মিছিল
চারদিকে শুধু ভয়
সবার মুখ তো ঢাকা
ফিসফিস কথা কয়
বন্ধ অফিস পাড়া
বন্ধ খেলার মাঠ
বন্ধ আড্ডা রকের
স্তব্ধ স্নানের ঘাট ।
জনাকুড়ি শ্রমজীবী
পরিযায়ী সব তারা
হারিয়েছে কাজ সব
পথেই নামলো তারা ।
সবাই ভাবলে আজ
ফিরতে নিজের বাড়ি
শুরু হোক শুধু হাঁটা
হাঁটাটাই দরকারি ।
বাড়িপথ কাছে নয়
অন্য রাজ্যে বাড়ি
দেড়শ কিলোমিটার
বন্ধ চাক্কা গাড়ি ।
পায়ে হেঁটে ফেরে বাড়ি
হেঁটে হেঁটে পায়ে পায়ে
ফিরতেই হবে শেষে
নিজদেশে নিজেগাঁয়ে ।
বড়রা পথেই হাঁটছে
হাঁটছে তো মকদম
দিনরাত থামা নেই
মেয়েটা ও হরদম ।
সকাল পেরিয়ে সাঁজ
সাঁজের ওপারে ভোর
হাঁটার বিরাম নেই
দুচোখে কেবলই ঘোর ।
এক মিনিটও দামি
চালিয়ে যাচ্ছে পা
জ্বলছে খিদেয় পেট
পেটের ভেতর হাঁ ।
তা বলে থামলে চলে !
ফিরতে হবেতো বাড়ি
থামলে হবেতো দেরি!
আরো জোরে তাড়াতাড়ি!!
সড়কপথ তো বন্ধ
বন্ধ নদীর ঘাট
ব্যারিকেড পথজুড়ে
গলিপথ ফাটা মাঠ ।
সরু সরু গলিপথ
ঝোপঝাড় পথে কাঁটা
জঙ্গল পথ কেটে
সারাদিন শুধু হাঁটা ।
কখনো ডিঙিয়ে টিলা
কখনো সাঁতরে জল
কখনো বা হামাগুড়ি
দুচোখে ই লোনাজল ।
হাইওয়ে লকডাউন
ব্যারিকেড পথজুড়ে
পুলিশের চোখ রাঙ্গা
তাইতো হাঁটছে ঘুরে ।
জঙ্গল পথঘাট
নির্জন শুনশান
হাঁটার বিরাম নেই
জামালো কঠিন প্রাণ ।
বড়রা হাঁপিয়ে ওঠে
ক্ষুধায় ক্লান্তি চোখে
জিরিয়ে নিচ্ছে ছায়ায়
আর সব বাকি লোকে ।
জামলো ভীষণ জেদি
ফিরতেই হবে গাঁয়ে
হেঁটেই যাচ্ছে শুধু
সামনেও বাঁয়ে ডাঁয়ে ।
ছোট্ট ছোট্ট পায়ে
পিছিয়ে পড়েই হাঁটা
রক্তে ভিজছে মাটি
বিঁধছে কাঁকর কাঁটা ।
মাথায় মারছে চাবুক
বোশেখ রোদের তাত
মেলেনি আঁজলা জলও
কিংবা ক্ষিদের ভাত ।
টলছে শরীর মাথা
জ্বলছে চোখের তারা
ক্লান্ত দেহের পেশী
ওযে আজ দিশেহারা ।
আতঙ্ক ঘিরে ধরে
ভয়কেই করে সঙ্গী
হাঁটছে ছোট্ট মেয়ে
হৃদয়ে জয়ের ভঙ্গি ।
এগোতে এগোতে পথ
পথ শেষ হেঁটে হেঁটে
এগোচ্ছে ছোট্ট মেয়ে
জঙ্গল কেটে কেটে ।
এভাবেই কাটে দিন
এভাবেই কাটে রাত
চারদিন ক্রমাগত
নেই জল নেই ভাত ।
কোথায় মিলবে খাবার
কোথায় মিলবে জল?
সবাই বললে শুধু
হেঁটে হেঁটে শুধু চল ।
হাঁটতে-হাঁটতে শেষে
পথ বুঝি শেষ হয়
এসে গেছে প্রায় ঘরে
বাড়ি যাবে নিশ্চয় ।
কিমি দশেক বাকি
কিংবা চৌদ্দ বারো
দেখতে পাচ্ছে গ্রাম
বাড়ায় গতি আরো ।
দেখতে পাচ্ছে মাঠ
মাঠের সবুজ ধান
ডাকছে নাকি মা’ও
পাচ্ছে ভাতের ঘ্রাণ!!
মাত্র ঘন্টাখানেক
কিংবা ঘণ্টা দুই
পৌঁছে যাবে ই শেষে
জন্মভূমির ভুঁই ।
দুচোখ ভরা আলো
গ্রামের পথে পা
ভুলেই গেছে পেটে
জ্বলছে খিদের হাঁ ।
হঠাৎ পেটের ব্যথা
পায়ে ভীষণ টান
ফিনকি দিয়ে বমি
ছটপট আনচান l
চোখে ভীষণ জ্বালা
বুক হাপরে টান
বুকের পাঁজর ভারি
ওষ্ঠাগত প্রাণ ।
যাচ্ছে ছিঁড়ে পেট
শক্ত চোয়াল মাড়ি
তবুও জিদ্দি মেয়ের
ফিরতেই হবে বাড়ি ।
জল জঙ্গল গাঁয়ে
ডাক্তারও কি থাকে?
মাওবাদীদের গাঁ
কেইবা খোঁজ রাখে?
তাও ভাগ্য ভালো
মিললো শেষে পথে
অ্যাম্বুলেন্স ও এল
চলল শেষে রথে ।
ডুকরে কেঁদে ওঠে
ফিরবে সে যে বাড়ি
যদিও পেটের ব্যথায়
ছিঁড়েই যাচ্ছে নাড়ি ।
হেঁচকি উঠছে মুখে
কিংবা বমির টান
স্তব্ধ বুকের হাপর
স্তব্ধ বুকের গান ।
অ্যাম্বুলেন্সে চেপে
জামলো এলো বাড়ী
শান্ত দু’চোখ বোজা
আকাশ পথে পাড়ি ।
নিথর হল পথ
নিথর হল দেহ
নিথর বছর বারো
নিথর হল গেহ ।
নিথর ভাতের হাঁড়ি
নিথর গণতন্ত্র
নিথর হল খিদে
হাসপাতালের যন্ত্র ।
ও মেয়ে তুই বোকা !
হেঁটেই মরলি শেষে!
আমার মে’তো আঁকছে
লকডাউনের দেশে ।
আমার মেয়েটা আঁকছে
“পৃথিবী পাচ্ছে প্রাণ !”
আমার মেয়েটা গাইছে
“সাম্যবাদের গানll”
ওমেয়ে তুই হাঁট —–
ও মেয়ে তুই ঘুমো —–
দিচ্ছি ক্ষিদের মুখে
প্রতিশ্রুতির চুমো ।
সরকারতো আছেই
আগেও যেমন ছিল
ক্ষতিপুরণ সমেত
একলাখই তো দিল ।
মরা মেয়ের টাকায়
বাপেতে কিনবে চাল
সাম্যবাদের গান
গাইছি তো আজকাল ।
ও মেয়ে তুই ঘুমো
জন্মালি কেন তুই !
পাপের কলম দিয়ে
তোর দেহকেই ছুঁই ।
তোরই ছোট্টো হাতের
কচি কোমল পাতায়
লিখছি “ক্ষমা করিস”
কিংবা “পরান যা চায়”!!
তোর উঠোনের কাছে
বৈঁচি পাকুড় আজও
অপেক্ষাতেই আছে
শিরিষ ডুমুর গাছও ।
ওই উঠোনের কাছে
একটা লঙ্কা আজও
আসবি বলে তুই
আজ রাখেনি কাজও ।
আজকে ভরল মেয়ের
ভাতের হাঁড়ির শব্দ
লক্ষ টাকায় রফা
খিদের মুখটা জব্দ ।
ঘুমোও মে’ ঘুমোও
আমার গল্প শেষ
এমনি করেই সারি
প্রায়শ্চিত্তের রেশ ।
খিদের গন্ধ কেমন?
খিদের কেমন স্বাদ?
জানেনা আমার মেয়ে
খিদে শুধু আহ্লাদ ।
লকডাউনের ঘরে
আঁকছে গাইছে সব
অনলাইনের ক্লাস
খুশিখুশি কলরব ।
ক্ষমা করে দিস মেয়ে
আমি তো নপুংশক
কি বলছে শুনে নিস্
এ দেশের রক্ষক ।
আমি এক ক্লীব জীব
আমার কি আছে বল
একটু পেনের কালি
একচোখ লোনা জল ।
আমার মেয়েই হবি
পরের জন্মে তুই
এটাই চাইছি আমি
তোর ছবিটাই ছুঁই ।
জামালো আমার মেয়ে
জামালো আমার ভাত
জামালো চোখের জল
মুষ্টিবদ্ধ হাত ।
জামালো ক্ষুধার ভাত
জামালো মানেনি হার
জামালোই প্রতিবাদ
জামালোই চিৎকার ।