TRENDS

করোনায় মৃত্যু হলে ঠাঁই হবেনা প্রতিষ্ঠিত শ্মশানে! আভিযোগ কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ সরকারের

Chandramani Saha

নিজস্ব সংবাদদাতা: করোনা নিয়ে সচেতনতার বদলে ভীতি আর কুসংস্কারই বাড়ছে এবং সেটা বাড়ছে খোদ কলকাতার মত মহানগরেই। করোনায় মৃত রোগীর দেহ বৈদ্যুতিক চুল্লিতে পোড়ালেও নাকি আশেপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে কালান্তক মারণ ভাইরাস। এমনই অবৈজ্ঞানিক যুক্তিতে ভর দিয়ে রাজ্যে করোনায় মৃত প্রথম রোগীর শেষকৃত্য নিমতলা শ্মশানঘাটে করতে বাধা দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে কলকাতা পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ঘন্টা তিনেক বাদে দাহ হলেও পরবর্তীতে ফের এমন অশান্তি রুখতে বড়মাপের সিদ্ধান্ত নিল কলকাতা পুরসভা।

ঠিক হয়েছে এবার থেকে করোনায় আক্রান্ত কোনও রোগীর মৃত্যু হলে ধাপায় দাহ ও পূর্ব কলকাতার বাগমারি কবরস্থানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। ধাপায় পুরসভার জঞ্জালের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে যেখানে দাবিহীন দেহ পুলিশের ব্যবস্থাপনায় দাহ করা হয় সেখানেই করোনায় ফের মারা গেলে শেষকৃত্যের ব্যবস্থা হচ্ছে। আর বাগমারির কবরস্থানের ভিতরেই আলাদা জায়গা ঘিরে দেওয়া হচ্ছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মৃতকে সেখানে সমাধিস্থ করা হবে বলে মেয়র জানিয়েছেন।

এপ্রসঙ্গে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, ‘ইলেকট্রিক চুল্লিতে দেহ দাহ হলে করোনা কেন, অন্য কোনও জীবাণু থাকে না। আবার মাটির নিচে কোনও দেহ চলে গেলে সেখানেও সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন পুরসভা মানছে।’ পুরসভা সূত্রে খবর, ৬৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় কলকাতার সমস্ত শ্মশানেই দাহ হয়ে থাকে। যেখানে মাত্র ৫২ ডিগ্রি উঠলেই করোনা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তাই যে বা যাঁরা সেদিন নিমতলা শ্মশানঘাটের চুল্লিতে দেহ পোড়ালে স্থানীয় জনপদে করোনা ছড়িয়ে পড়বে ভেবেছিলেন তাঁদের ‘হুজুগে ও গুজব সৃষ্টিকারী’ বলে কটাক্ষ পুরকর্তাদের। আর মৃতদেহ মাটির নিচে গেলে যে ভাইরাসটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে তার প্রমাণ চিন বা ইরানে করোনায় গণকবর দেওয়া হয়েছে।

মেয়র জানান, বাংলা বা দেশে করোনায় আর কোনও মৃত্যু হোক আমরা চাই না। কিন্তু, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ মেনেই সমস্ত শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে। সেদিন আইসিএমআরের গাইডলাইন মেনে দমদমের প্রৌঢ়ের দাহ সমাপ্ত হওয়ার পর গোটা চুল্লিটি বিশেষভাবে স্যানিটাইজ করা হয়।
নিমতলা শ্মশানে করোনায় প্রথম মৃত রোগীর শেষকৃত্য নিয়ে যে চরম অশান্তি হয়েছিল, তা সামাল দেওয়ায় পুরসভার স্বাস্থ্য কর্মীদের বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ। কারণ, সেদিন বাসিন্দাদের হুমকি ও সহকর্মীদের একাংশের উসকানি উপেক্ষা করে দুই স্বাস্থ্যকর্মী দমদমের ওই প্রৌঢ়ের দেহ দাহ করেন। বুধবার সেই দুই কর্মীকে পুরসভার তরফে আড়াই হাজার টাকা ও বিশেষ স্বীকৃতির শংসাপত্র তুলে দেন স্বাস্থ কর্তারা। ধাপায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ টিমও তৈরি হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল প্রশাসন যদি সব জেনেও এই অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারের কাছে মাথা নত করে তবে তার ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হবে গ্রামে। সম্প্রতি এর নিদর্শন মিলেছে পূর্ব মেদিনীপুরে। ভিন রাজ্যের এক যুবক মানসিক অবসাদে আত্মহত্যা করার পর তার পরিবার সেই দেহ নিয়ে এলে গ্রামবাসীরা তার করোনা হয়েছিল এবং সেই কারনেই সে মানসিক অবসাদে ফাঁসি নিয়েছে এই অজুহাত তুলে গ্রামের দুটি শ্মশানে পোড়াতে দেয়নি। পরিবারকে মৃতদেহ আনার পর ৩৬ঘন্টা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে পড়ে রইতে হয়েছিল। এরপর করোনাতে কারও মৃত্যু হলে বা না হলেও যদি তাঁর করোনাতে মৃত্যু হয়েছে এমন গুজব কেউ তুলে দেয় তবে তাঁর সৎকার করাই মুশকিল হয়ে পড়বে।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join