TRENDS

ব্রিগেড যাবে গড়বেতার যৌবন! লালঝান্ডার সুনামিতে টুম্পা সোনা গানের তালে পা মেলালো হাজার জনতা

Chandramani Saha

ব্রিগেড যাবে গড়বেতার যৌবন! লালঝান্ডার সুনামিতে টুম্পা সোনা গানের তালে পা মেলালো হাজার জনতাপলাশ খাঁ, গোয়ালতোড় :- এযাবৎ কালের নজির বিহীন লাল ঝান্ডার মিছিলে ভাসল গড়াবেতা। আগামী ২৮শে ফেব্রুয়ারি ব্রিগেড যাওয়ার থিম সং সেই ‘টুম্পা সোনা’র তালে তালে পা মিলিয়ে হাঁটল হাজারেরও বেশি জনতা। লালঝাণ্ডা কাঁধে নিয়ে মানুষের এই আবেগ দেখে নিজেদের পুরানো জমি ফিরে পেতে আশায় বুক বাঁধছে বামেরা। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতাতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রিগেড বার্তা দিতে সিপিএমের মিছিলে এলাকার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে উপস্থিত কমরেডরা বলেই ফেললেন এযেন গড়বেতাতে লালঝাণ্ডার সুনামী।

বাম ও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এদিন এই মিছিলের ডাক দেওয়া হয় গড়বেতার ফতেসিংপুরের ঝাড়বনীতে শুরু হয় পদযাত্রা। চারঘন্টা রাজপথ দখল নিয়ে ধাদিকাতে গিয়ে শেষ হয় এই মিছিল। মিছিলের সুচনা করেন সিপিআইএমের জেলা সম্পাদক তরুণ রায়, এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পার্টি নেতা তাপস সিনহা, তপন ঘোষ, দিবাকর ভূঁইয়া প্রমুখ।

গড়বেতার বাম নেতারা বলছেন, ‘ব্রিগেডকে সামনে রেখে যৌবনের ঢল নেমেছে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। চলো চলো ব্রিগেড চলো। রণ হুঙ্কারে লাল ঝান্ডায় সাজছে একের পর এক বদ্ধভূমি। ব্রিগেডের উত্তাপ নিতে আর জোট সরকার গড়ার শপথ নিতে দলবদ্ধ হচ্ছেন নিপিড়ীত বঞ্চিত অত্যাচারিত মানুষ।’

মিছিলে হাঁটা ফতেসিংপুরের যুবক সালালউদ্দিন জানালেন, ‘ শাসকদলের সন্ত্রাস আর পুলিশের মিথ্যা মামলায় জর্জরিত এখানকার মানুষ আবার কোনোদিন  লালঝান্ডা ধরতে পারবে এই বিশ্বাসটাই যেন হারিয়ে ফেলেছিল। আর এখন  গ্রাম মৌজায় উঠানে বসছে ইতিমধ্যে বৈঠকি সভা। ঘুরে দাঁড়ানোর আর প্রতিরোধের চেহারায় হিম্মৎ দেখানোর স্বপ্ন নিয়েই মানুষ জোট বদ্ধ হচ্ছেন লালঝান্ডা হাতে নিয়েই। ফেরাতে হাল এবার বাংলায় লাল আজ মাইলস্টোন হয়েছে মানুষের মুখে মুখে। চমকাইতলা থেকে সন্ধিপুর, আমলাগোড়া থেকে আমলাশুলি এমন বদ্ধভূমি ছিন্ন করে মানুষ এসেছেন কাতারে।”

পরিবর্তনের প্রথমদিনেই গড়বেতায় জিতেন নন্দী কে খুন। এখনো পর্যন্ত সেই সংখ্যা নয়জন।একসময় এমন গ্রামের নামগুলো লেখা হতো, ছাপা হতো দৈনিক সংবাদ পত্রগুলিতে সিপিআইএম কর্মী, নেতাদের লাশ হয়ে যাওয়ার ছবি দিয়ে কলসীভাঙা, পাথরি, ঢ্যাঙাশোল, মধুপুর, লক্ষনপুর এসব গ্রামগুলিতে মাওবাদী জল্লাদেরা লাল ঝান্ডার সমর্থকদের খুন সহ বধ্যভূমি তৈরী করেছিল। নৃশংসতার চরমতম ছবি নিত্যদিন দেখা যেত ঐ সব গ্রামগুলিতে। মেদিনীপুর ছাড়িয়ে ধেড়ুয়া বাস রাস্তার মূল স্টপেজ চাঁদড়া। কংসাবতী নদীর পাশে পাশে শাল বনে ঘেরা গ্রামগুলিতে মূলতঃ চাষবাসের ওপরেই প্রায় সবাই নির্ভরশীল।গ্রামবাসীদের একটাই দোষ ছিল তারা সিপিআইএম দলের কর্মী সমর্থক। তাই গন আদালতের নামে বাড়ি থেকে জোর করে তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে মাওবাদীরা নৃশংস ভাবে কুপিয়ে ,গুলি করে খুন করে প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে রাখতো।অনেককেই আবার আধমরা করে জঙ্গলে পুঁতে দিয়েছে। তারা আজো পরিবারের কাছে নিখোঁজ।

ধাদিকার যুবক আলোক ঘোষ বলেন, ‘ না দিদিমনির দশ বছরে তাদের লাশের খোঁজ করা হয়নি। কি করে হবে যারা তখনকার খুনী তারাই তো দিদির দৌলতে থানায় পুলিশের পোশাক পরে বসে আছে। তাই খুনের তদন্ত হয় না।দোষীর শাস্তি? সেটা দিদির আমলে ভাবাই যায় না। আর সেই খুনীরা এখন পঞ্চায়েত চালাচ্ছে লুঠের মধ্য দিয়ে। আর চাকরি পেয়েছে খুনি মাওবাদীরা। সব হিসাব রেখেছি আমরা।”

সিপিএম নেতারা বলছেন, ‘ শুধু কি খুন? দিনের পর পর শত শত কমরেডদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর,সর্বস্ব লুট করা হয়েছে। যারা করেছে তারা পরিবর্তনের সরকারে চাকরি করছে বা নেতাগিরি করছে।তখনকার ওদের নেতা এখন তাদের দলের রাজ্য নেতা। আর সেই সব লালঝান্ডা ধরা পরিবারগুলির কেউ তাদের বাবাকে, কেউবা ভাইকে,কাকাকে এরকম কোন না কোন আত্মীয় হারা ,বাড়ি ছাড়া হয়ে অন্যের আশ্রয়ে কোনরকমে দিন কাটিয়েছে।এমনকি কারো দেওয়ালে সিপিআইএম দলের প্রতীক বা লেখা থাকলেও তাকে সবার সামনে নির্মম ভাবে লাঠিপেটা করা হয়েছে।”

ভীত সন্ত্রস্ত মানুষগুলি জানিয়েছেন, তাঁদের  বিশ্বাসটাই হারিয়ে ফেলেছিল যে তাদের গ্রামে কোনদিন লাল ঝান্ডা উড়তে পারে। মিথ্যা মামলা আর জেল দুই সাঁড়াশি আক্রমনে পার্টি কমরেড থেকে নেতৃত্ব নিঃস্ব। চাষের জমিব দখল। অভিভাবকহীন অবস্থায় নিজেদের মতো করে শত যন্ত্রনা দাঁতে দাঁত চেপে বাঁচার আর ভিটে টুকু রক্ষা করার আপ্রান চেষ্টা চাকিয়ে নীরব থেকেছেন।
যখন দেখেছেন মানুষ এবার জোট বেঁধেছে। সড়ক দখল করে প্রতিরোধের বার্তায় লাল ঝান্ডার মিছিল হচ্ছে। রুটি রুজির দাবী থেকে কৃষি কৃষকের সমস্যা সমাধানের লড়াই তীব্র হচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষ সেই দাবীকে নিজেদের দাবী মনে করেই লাল ঝান্ডার লড়াইতে সামিল হচ্ছেন।

এনায়েতপুর থেকে কলসিভাঙা, গোয়ালতোড়ের ভালুক বাসার জঙ্গল থেকে সিজুয়া, বহড়াশোল থেকে আমলাশুলি, ওড়িস্যার বর্ডার বড়াই মোহনপুর দাঁতন সোনাকোনিয়া থেকে ঝাড়খন্ডের বর্ডার গোপীবল্লভপুর থেকে জামাইমারি আর কেশপুর গড়বেতা কিংবা নারায়নগড় সবং পিংলা এমন একের পর এক বদ্ধভূমির একের পর এক মৌজায় সাজছে লাল ঝান্ডায় আর বৈঠকী সভা সহ স্কোয়াড মিছিল চলো চলো ব্রিগেড চলো। বাম কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক সরকার গঠনের শপথ নিতে।

পাট্টা জমি, বর্গাজমির পুনরুদ্ধার সংগ্রাম, লুঠের পঞ্চায়েত সরিয়ে জনগনের পঞ্চায়েত গড়তে হলে জোটের সরকার গড়াই একমাত্র বিকল্প। আর সাহস ভরষা জোগাচ্ছে সেই জমাটবদ্ধ আন্দোলনে। আর সেই জোটবদ্ধ আন্দোলনের সুচনা হলো মেদিনীপুরের মাটিতেই।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join