TRENDS

খড়গপুর আর ডেবরার শশ্মানে জ্বলল অকাল আগুন! কারও স্ত্রী আড়াই মাসের গর্ভবতী, কারও স্ত্রীকে সাজানো হল শেষ সিঁদুরে

Chandramani Saha
খড়গপুর আর ডেবরার শশ্মানে জ্বলল অকাল আগুন! কারও স্ত্রী আড়াই মাসের গর্ভবতী, কারও স্ত্রীকে সাজানো হল শেষ সিঁদুরে
শেষ সজ্জায় বাপী নায়েকের স্ত্রী

নিজস্ব সংবাদদাতা: বড় নির্মম অথচ আনুষঙ্গিক সামাজিক প্রথা। খড়গপুরের গোপালনগরে বাপী নায়েককে যখন হরিশচন্দ্র শশ্মানে নিয়ে যাওয়ার জন্য সহকর্মীরা তাঁর দেহ ঢেকে দিচ্ছেন কান্না ভেজা চোখে তখন বাপীর স্ত্রীকে তাঁর আত্মীয়রা সাজিয়েছেন নববধূর সাজে! এক মাথা সিঁদুর আর গলায় ফুলের মালা পরে স্বামীর শবদেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুই সন্তানের জননী। কিন্তু দেহ কোথায়? আপ ফলকনামা সুপারফার্স্ট এক্সপ্রেসে দলা পাকিয়ে যাওয়া একটা বড়সড় মাংস পিন্ড! খড়গপুর মহকুমা হাসপাতালের মর্গের কর্মীরা তাকেই কোনোমতে জুড়ে দিয়েছে সেলাই ফোড়ন করে। সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া সেই লাশকেই শেষ আলিঙ্গনে চিরবিদায় জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন অকাল বৈধব্যকে বরণ করতে যাওয়া মহিলা! ৪২ বছরের বাপী রেখে গেল ক্লাশ টেনে পড়া ছেলে আর থ্রিতে পড়া মেয়েকে।

বাঁদিক থেকে নিপেন, বাপী, মানিক
বাঁদিক থেকে নিপেন পাল, বাপী নায়েক, মানিক মন্ডল

কৌশল্যার নিপেন পালের দেহ জ্বলেছে কৌশল্যা শ্মশানে। বছর চুয়ান্নর নিপেনের বাড়িতে বাবা মা ভাই রয়েছে। স্ত্রী ছাড়াও রয়েছে সন্তানেরা। সহকর্মী গৌতম, দিপু, অশোক, যোগী আর এভি রাওরা তাঁর শশ্মানযাত্রার সঙ্গী হয়েছিলেন। হাজির ছিলেন দক্ষিণপূর্ব রেলের মেনস ইউনিয়নের সহকারী সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত মল্লিক। গোটা কৌশল্যা ভেঙে পড়েছে যেন শ্মশানে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন মানুষটা। তাঁদের বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে যে মানুষটা আর নেই।

খড়গপুর আর ডেবরার শশ্মানে জ্বলল অকাল আগুন! কারও স্ত্রী আড়াই মাসের গর্ভবতী, কারও স্ত্রীকে সাজানো হল শেষ সিঁদুরে
৩ বছর আগের সেই দিন! নববধূর সাথে মানিক

ওদিকে ডেবরা থানার ভবানীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পশ্চিম দ্বারখোলা গ্রামে যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছে হাহাকার। খড়গপুর মহকুমা হাসপাতালের মর্গ থেকে সহকর্মীদের সাথে কাঁসাই নদী পেরিয়ে ৩৩ বছরের মানিক মন্ডলের লাশ পৌঁছেছে রাত গড়িয়ে। এমনিতেই গ্রামে রাত ৯টা বাজলেই মধ্যরাত কিন্তু এদিন পশ্চিম দ্বারখোলা জেগে রয়েছে প্রিয় সন্তানকে শেষ দেখার জন্য। বাবা-মার একমাত্র সন্তান ৩৩ বছরের মানিক বিয়ে করেছিল মাত্র ৩ বছর আগেই। আড়াই মাস আগে খুশির খবর শুনিয়েছিল স্ত্রী। বাবা হতে চলেছেন তিনি। না, সন্তানের মুখ দেখা হলনা তাঁর। শনিবার সকাল ৯.৫৫তে আপ ফলকনামা সুপারফার্স্ট এক্সপ্রেস পিষে দিয়ে গেছে তাঁকেও। খবর পাওয়ার পর থেকেই ঘন ঘন জ্ঞান হারাচ্ছেন ৭৫দিনের গর্ভবতী, এখন আর কাঁদার শক্তিও নেই। সাত সকালেই ছেলের জন্য টিফিন কেরিয়ারে খাবার সাজিয়ে দিয়েছিলেন মা। ফেরৎ এসেছে সেই কৌটা। দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি তাঁর। এদিন প্রায় অৱন্ধন পশ্চিম দ্বারখোলা গ্রামেও।

সহকর্মীরাই আজ শ্মশানবন্ধু!গ্রামেরই এক যুবক দেবাশিস নায়েক,পেশায় আ্যম্বুলেন্স চালক জানালেন, এত ভালো ছেলে ! আমাদের গ্রামের সবারই প্রিয়। হাসিখুশি পর্পোকারী মানুষটা এইভাবে চলে যাবে ভাবতেই পারিনি। গোটা গ্রাম জুড়েই এখন শোকের পরিবেশ। এমন মর্মান্তিক ঘটনার স্বাক্ষী হতে হবে কোনোও দিন ভাবতেই পারিনি। একটা পুরো পরিবারই যেন ধ্বংস করে দিলেন ঈশ্বর। ডেবরার রাধামোহনপুর রেলের কোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশে কিষান বেশররার পরিবার। বর্তমানে কলকাতার আমরি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিষান বেঁচে গেলেও যেতে পারেন কিন্তু একটা পা বোধহয় সারাজীবনের মতই অকেজো হয়ে যাবে। চারজনের মধ্যে তিনিই একমাত্র বেঁচে গিয়েছেন। কোনোভাবে নিজের শরীরটা বের করতে পেরেছিলেন, পা টা থেকে গিয়েছিল লাইনেই। কিন্তু ৩ সহকর্মীর দুমড়ে মুচড়ে দলা পাকিয়ে যাওয়া দেহ তাড়া করছে তাঁকেও। ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি এখনও।

খড়গপুর আর ডেবরার শশ্মানে জ্বলল অকাল আগুন! কারও স্ত্রী আড়াই মাসের গর্ভবতী, কারও স্ত্রীকে সাজানো হল শেষ সিঁদুরে
ওরা কেমন আছে? জানতে চাইছে কিষান

উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি বসেছে। যেমনটা বারবার দুর্ঘটনার পরে বসে। কমিটির রিপোর্টও বেরুবে একদিন। কে দোষি, কে নির্দোষ হয়ত তার চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে কিন্তু আর কোনোও দিনই ঘরে ফিরবেনা তিন শ্মশানের অকাল আগুনে জ্বলে যাওয়া মানুষগুলো। হাহাকার আর অকাল বৈধব্য, পুত্র হারা মা-বাবা আর পিতৃ হারা নাবালক কিংবা এখনও জন্মায়নি যে শিশু তাঁদের সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে হাওড়া-সেকেন্দ্রাবাদ সুপারফার্স্ট এক্সপ্রেস। হয়ত এই একটি ট্রেনে কোনোও দিনও উঠতে পারবেনা এরা।                          ছবি পারিবারিক ও সহকর্মীদের সৌজন্যে

 

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join