জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল- ১১১ ।। চিন্ময় দাশ

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল                                                                            চিন্ময় দাশকিশোর-কিশোরী মন্দির, শিলদা (থানা– বিনপুর, মেদিনীপুর)
মন্দির স্থাপনার প্রসঙ্গ আলোচনায় এলে, মেদিনীপুর জেলার দুই রানির নাম উল্লেখ করতে হয়। একজন ছিলেন জেলার একেবারে পূর্বপ্রান্ত ছুঁয়ে, নদী-নালা-সাগরের এলাকায়– মহিষাদলে। তিনি রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায়ের পত্নী রানী জানকি দেবী। অনেকগুলি বড় মাপের দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।
অন্যজনের অবস্থান ছিল পাহাড়-জঙ্গল, টিলা-টিকর-ডুঙরি অধ্যুষিত লালমাটির দেশে। জেলার একেবারে পশ্চিমের এলাকায়– শিলদাতে। তিনি রাজা কিশোরমণি। হ্যাঁ, রাজা। জমিদারি পরিচালনায়, প্রজাকল্যাণে, গঠনমূলক কাজের ভূমিকায় এতটাই দক্ষ ছিলেন, কোন কোনও ইতিহাসকার তাঁকে ‘রাজা’ বলেই উল্লেখ করেছেন। আমরাও গভীর শ্রদ্ধায়, সেই অভিধাকে মান্যতা দেওয়ার পক্ষপাতী।

শিলদার এই রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জনৈক মেদিনীমল্ল নামক এক বীরপুরুষের হাতে। প্রবল পরাক্রমী মেদিনীমল্ল স্থানীয় এক রাজা বিজয় সিংহকে পরাস্ত করে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ইং ১৭৮৭ সালে, ‘দশ-সালা বন্দোবস্ত’-এর সময়, মেদিনীপুরের জেলা কালেক্টর, মল্লবংশের রাজা মানগোবিন্দ সিংহের কাছ থেকে, যে তথ্য সংগ্ৰহ করেছিলেন, তা থেকেই এই বংশের বিবরণ জানা যায়। মানগোবিন্দ ছিলেন মেদিনীমল্লের প্রপৌত্র।
১৮০৬ সালে অপুত্রক মানগোবিন্দের মৃত্যুর পর, তাঁর অন্যতম পত্নী রানি কিশোরমণি দেবী জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
শৈবভূমি শিলদা। বহু অতীত কাল থেকে বাবা ভৈরব এখানে প্রতিষ্ঠিত আছেন। শিলদার অদূরে, ওড়গোঁদায় বিশাল ব্যাপ্ত এক প্রান্তরে, আজও তাঁর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। সেই ধারায় শিলদার রাজবংশও ছিল শিবের উপাসক।

১৮৪৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪২ বছর রাজত্ব করেছেন কিশোরমণি। রাজধানী সদর শিলদা এবং নিজের জমিদারি মহাল মিলিয়ে ১২টি শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। তবে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্বে, মেদিনীপুরের অন্যান্য রাজা-জমিদারদের মত, চৈতন্যদেবের প্রচারিত প্রেমধর্মের অনুসারী হয়ে, তিনিও বৈষ্ণবীয় রীতিতে দেবার্চনার পথিক হয়েছিলেন। রাজবাড়ির অঙ্গনের ভিতরেই দুটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিশোরমণি– দালান-রীতির একটি রাধাকৃষ্ণ মন্দির এবং বর্তমান আলোচ্য কিশোর-কিশোরী মন্দিরটি।
রানির মৃত্যুর পর, সম্পত্তির মালিকানার বিবাদ, মামলা-মোকদ্দমায় জেরবার হয়ে, দেবতার সেবাপূজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দেবতার বিগ্রহগুলিও লোপাট হয়ে যায় মন্দির থেকে। পরিত্যক্ত মন্দিরটি সম্পূর্ণ ধ্বংসের পথিক হয়ে উঠেছিল।

১৬/১৭ বছর আগে, স্থানীয় ‘তরুণ সঙ্ঘ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে জীর্ণ মন্দিরটির পাশে। নতুন করে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মন্দিরে। পুরোহিত নিয়োগ করে সেবাপূজার প্রচলন হয়েছে দেবতার।
একটি প্ৰতিষ্ঠা-লিপি আছে মন্দিরে। তা থেকে জানা যায়, ১৭৪২ শকাব্দে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ ইং ১৮২০ সালে নির্মিত হয়েছিল এটি। সেই হিসাবে, ২০০ বছর আয়ু পূর্ণ করেছে মন্দির সৌধটি।
ল্যাটেরাইট বা ঝামা পাথরে তৈরি পূর্বমুখী এই মন্দির। নির্মিত হয়েছে চালা-শৈলীর আট-চালা হিসাবে। বেশ বড় মাপের বর্গাকার সৌধ।
মন্দিরের পাদপীঠ বেশ উঁচু, এবং নকশাকাটা। তার উপর একটি প্রদক্ষিণ পথ আছে মন্দিরকে বেষ্টন করে। মন্দির পূর্বমুখী, কিন্তু মন্দিরে উঠবার ৭ ধাপ সিঁড়িটি দক্ষিণে রচিত হয়েছে। অবশ্য, পূর্বদিকের মূল দ্বারপথটি ছাড়া, গর্ভগৃহে দক্ষিণেও একটি অতিরিক্ত দ্বার আছে, প্রধানত পুরুত ঠাকুরের জন্য। দুটি দ্বারপথই খিলান-রীতির।
অলিন্দ এবং গর্ভগৃহ– দুটি অংশ মন্দিরের। অলিন্দের সামনে খিলান-রীতির তিনটি দ্বার। পিছনের দ্বারটি গর্ভগৃহের সাথে যুক্ত। অলিন্দের স্তম্ভগুলি ইমারতি রীতির।
আট-চালা মন্দির। কিন্তু দ্বিতলে কোনও কক্ষ বা দেওয়াল নাই। প্রথম তলের চারটি চালের মাথায়, উপরের চালগুলি চেপে বসানো। অনুমান করা যায় কি যায় না– এমন সংস্থান।

প্রথম তলের ছাউনির নীচের প্রান্তগুলিও দেওয়ালের সাথে সাঁটানো। এমনটা বড় একটা দেখা যায় না। শীর্ষক অংশে বেঁকি, আমলক, পর পর কলস এবং বিষ্ণুচক্র স্থাপিত। সমস্ত মন্দির মোড়া হয়েছিল মসৃন পঙ্খের আস্তরণে।
মন্দিরের সামান্য দক্ষিণে, রাজবাড়ীর মূল ফটক। তার মাথায় দো-চালা রীতির বড় মাপের একটি নহবতখানা। ফটকের দু’পাশে হাতিশাল, ঘোড়াশাল। সামনে একটি বড় মাপের রাসমঞ্চ স্থাপিত।  রাজবাড়ী, কাছারিঘর কিছুই টিকে নেই আজ আর। কেবল জীর্ণ দেবালয় দুটিই যা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি এখনও।
সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী নিমাই চন্দ্র নাদ, কৌশিক নাদ, সুরজিৎ লাহা, প্রণবানন্দ চক্রবর্তী– শিলদা।
পথ-নির্দেশ : মেদিনীপুর-খড়গপুর থেকে ঝাড়গ্রাম হয়ে, বাঁকুড়া থেকে রায়পুর হয়ে, পুরুলিয়া থেকে ঝিলিমিলি-বেলপাহাড়ি হয়ে শিলদা পৌঁছানো যাবে।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Share
Published by
Chandramani Saha

Recent Posts

Extra Marital Affair: পরকীয়ার ‘ভিডিও’ই কাল! দুই বউ থাকা সত্ত্বেও গোপন সম্পর্ক, পিংলায় গ্রেফতার!

অভিরুপ মাইতি, খড়গপুর: দু’টি বিয়ের পরেও ফের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া, আর তারই জেরে শেষ পর্যন্ত…

৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার জাল নোট-‌সহ আটক সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র! চাঞ্চল্য মালদহে

লক্ষাধিক টাকার জাল নোট-‌সহ আটক সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র। পুলিশ নাবালকের কাছ থেকে ৪ লক্ষ…

রাশিয়ায় স্পেশ‍্যাল অলিম্পিকসে ভারতের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হলেন অভিনেতা সোনু সুদ!

বলিউড অভিনেতা সোনু সুদ করোনার সময়ে সাধারণ মানুষের ত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন। জুটেছিল বাস্তব জীবনের হিরোর…

Gangrape & Murder: বিয়ের নয় পড়াশুনা করতে চেয়েছিল কিশোরী! বদলা নিতে ধর্ষণ করে কীটনাশক খাইয়ে খুন

নিজস্ব সংবাদদাতা: স্কুল কিংবা টিউশন পড়তে যাওয়ার পথে কিশোরীর দিকে চেয়ে থাকত লোলুপ দু'টো চোখ।…

Boy save Train: সাত বছরের খুদে বাঁচিয়ে দিল দ ক্যানিং লোকাল!

বিশ্বজিৎ দাস:- ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পেল ক্যানিং স্টাফ স্পেশাল ট্রেন। তাও মাত্র সাত…

Job: ইতিহাসে ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট! গোল্ড মেডেল শিকয়ে তুলে ডোম পদেই চাকরি চান স্বর্ণালী

নিজস্ব সংবাদদাতা: লকডাউন কেড়ে নিয়েছে তাঁর এবং স্বামীর পেশা। একরত্তি মেয়ে কে নিয়ে সংসার ভাসছে…