TRENDS

মধ্যরাতে সূর্য উঠল অরুন, আসলাম বিকাশদের দুনিয়ায়, খড়গপুরের কোয়ারেন্টাইন থেকে বাস ছুটল ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, মুর্শিদাবাদে

Chandramani Saha

নিজস্ব সংবাদদাতা: কেউ সাতদিন, কেউ ১০দিন, কেউ বা তারও চেয়ে বেশি আটকে ছিলেন। খড়গপুর বিদ্যাসাগর শিল্প তালুক কিংবা রূপনারায়নপুরের সরকারি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার অথবা কোনও বেসরকারি হোটেলে গড়ে তোলা কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে থাকা ৫৯জন পরিযায়ী শ্রমিক। কেউ ওড়িশার জাজপুর, কেউ ভুবনেশ্বর আবার কেউ আরও দুরে বেরামপুর। কেউ পায়ে হেঁটে এসেছেন ১৫০কিলোমিটার কেউ ৩০০ কিলোমিটার। হঠাৎ করে লকডাউন! বাড়ি ফেরার ট্রেন বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিন রাত পায়ে হেঁটেছেন ভারত নির্মানের বিশ্বকর্মার দল। কিন্তু শেষ অবধি বাড়ি ফেরা হয়নি।

করোনা সন্ত্রাস থেকে বাঁচাতে সরকার তাঁদের রাস্তায় আটকেছে, নিয়ে এসে তুলেছেন কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে। আর তারপর থেকে শুধুই থেকে যাওয়া আর অপেক্ষায় থাকা। কবে দিন শেষ হবে! সেই দিন শেষ হল শুক্রবার রাতে। খড়গপুর বিদ্যাসাগর শিল্প তালুকের ভেতরে ঢুকল লম্বা ঝাঁ চকচকে একটা বাস, দক্ষিনবঙ্গ রাষ্ট্রিয় পারিবহনের। ব্যাগ বাক্স গুছিয়ে রাখা ছিলই। লাইন দিয়ে উঠে পড়লেন একে একে ৫৯জন। বাস তাঁদের ঝাড়গ্রাম পুরুলিয়া হয়ে মুর্শিদাবাদ পৌঁছে দেবে।

পুলিশের একটা লম্বা বাহিনী নিয়ে পুরো বিষয়টার তদারকি করছিলেন খড়গপুরের দায়িত্ব প্রাপ্ত জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজি সামসুদ্দিন আহমেদ। তালিকা ধরে শ্রমিকদের বসার ব্যবস্থা করে দিয়ে বাসের চালককে শেষবার বুঝিয়ে দিলেন রুট ম্যাপ। কোয়ারেন্টাইনে থাকা শ্রমিকদের হাতে ধরিয়ে দিলেন ফিট সার্টিফিকেট। এই সর্টিফিকেট ছাড়া নিজের এলাকায় গিয়েও ঘরে ঢুকতে পারবেননা, ফের কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে শ্রমিকদের। তাই পইপই করে বুঝিয়ে দিলেন সাবধানে রাখতে হবে সেটা। এর আগে শ্রমিকদের চেক আপ করে নেওয়া হয়েছিল। লম্বা জার্নিতে রাস্তায় খাওয়া দাওয়ারও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। দুর্গা দুর্গা করে বাস ছেড়ে দিল।

ঝাড়গ্রামের অরুন শবর, পুরুলিয়ার বিকাশ মাহাত, মুর্শিদাবাদের সেখ আসলাম। কদিন আগে কেউ কেউ কাউকে চিনতনা। কেউ আটক হয়েছিল সোনাকোনিয়া, কেউ মকরামপুর, কেউ আবার ডেবরায়। কদিন একসাথে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে থাকতে আলাপ জমে গেছে। একে অপরের ফোন নম্বর বিনিময় করেছে আর কথা দিয়েছে যোগাযোগ রাখবে জীবন ভোর। করোনার দুর্যোগ কেটে যাবে একদিন। দুনিয়া আবার সচল হবে। আবার কাজে বেরুবে পরিযায়ীর দল, কাজে নামবে নতুন ভারত নির্মানে।

মোবাইলে রিং বেজে ওঠে। কেউ বলে আর একটা রাত আম্মি, বাড়ি পৌঁছে যাব। কেউ ফোনেই আদর করে দেয় মেয়েকে। সবারই চোখের কোনে জল চিকচিক করে ওঠে বাড়ি ফেরার আনন্দে। এখানে বজরঙি নেই, জামাতি নেই, শুধু ঘরে ফেরার জন্য আকুল মানুষ আছে। অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে শিল্প তালুক। কল কারখানা বন্ধ, আলো নেই। সেই অন্ধকার চিরে বাসের আলো, যেন সূর্যকিরণ হয়ে জ্বলে, ঘরে ফেরার সূর্য।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join