TRENDS

লকডাউনের রাস্তায় আঁচল পেতে ভিক্ষা করেন চলচিত্র শিল্পী, বাংলার একদা যাত্রাসাম্রাজ্ঞী, চাইছেন মুক্তির মৃত্যু আসুক খুব তাড়াতাড়ি

Chandramani Saha

নিজস্ব সংবাদদাতা: হঠাৎ দেখলে মনে হতেই পারে যে আপনি দিনের বেলায় পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা বাজারের রাস্তায় যাত্রা দেখছেন আর সেই যাত্রায় ভিখারিণীর ভূমিকায় অভিনয় করছেন একদা যাত্রাসাম্রাজ্ঞী মধুমিতা চক্রবর্তী। আপনি ভাবতেই পারেন, নায়িকা থেকে বৌদি আর পরের দিকে মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করা মধুমিতা কোনও নতুন পালায় ভিখারিণীর ভূমিকায় অভিনয় করছেন। আপনি আরও ভাবতে পারেন লকডাউনের বাজারে নিঃস্ব রিক্ত অসহায় দরিদ্র মানুষগুলোর কথা না ভেবেই মাত্র ৮ ঘন্টার নোটিশে দেশ জুড়ে যেন যুদ্ধের আবহে ডেকে ফেলা এই লকডাউনে ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া লাখো লাখো শ্রমিকের না খেতে মায়ের ভূমিকায় মধুমিতা চক্রবর্তী।লকডাউনের রাস্তায় আঁচল পেতে ভিক্ষা করেন চলচিত্র শিল্পী, বাংলার একদা যাত্রাসাম্রাজ্ঞী, চাইছেন মুক্তির মৃত্যু আসুক খুব তাড়াতাড়ি

যার ভিক্ষা করার কথা নয় অথচ ছেলে স্বামী ফিরতে না পারায় আর টাকা পাঠাতে না পারায় তাঁকে ভিক্ষা করতে হচ্ছে এমনই কোনও পালা লিখেছেন পালাকার। আর সেই পালায় নিজের ৪০ বছরের শিল্প মেধা উজাড় করে দিয়ে নিখুঁত অভিনয় করে চলেছেন মধুমিতা, আঁচল পেতে ভিক্ষা চাইছেন পথ চলতি মানুষের কাছে। কিন্তু না, ভুল ভাঙবে আপনার যখন দেখবেন শুধু পথ চলতি মানুষ নয়, মধুমিতা তাঁর আঁচল পেতে যাচ্ছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারেও।সত্যি সত্যি ভিক্ষে করছেন মধুমিতা, নিজের জন্য আর অসুস্থ স্বামী একদা যাত্রার নায়ক তমস কুমারের জন্য।

কলকাতার যেমন চিৎপুর রয়েছে সমগ্র দক্ষিনবঙ্গ আর উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, বিহারের জন্য রয়েছে রয়েছে বেলদা। ছোট বড় মিলিয়ে অন্তত ২৫টা দল প্রায় ২৫০০ কলাকুশলী, পালাকার, বাজনদার, নির্দেশক, আলো আর মাইক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরশুম এলে। পৌষে ধান কাটা শেষ হলে বাংলা, বিহার,ঝাড়খণ্ড,উড়িষ্যায় যাত্রার ধুম। পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে রাতের পর রাত জাগে মেহনতি জনতা। বিনোদন মানে যাত্রা আর সেই বিনোদনের বিনোদিনী রাই এই মধুমিতারাই। লকডাউন ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে সব। পালা তোলার এই মরশুমে বন্ধ মহলা কক্ষ। দিনান্তের রোজগার। আড়াই হাজার পরিবারের অন্তত ১০ হাজার মানুষ এখন মধুমিতা। আঁচল পেতে ভিক্ষা করার অবস্থায়।
মধুমিতার জীবনের চল্লিশ বছর আগের কথা। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে স্নাতক মধুমিতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের একাউন্টের বিভাগের কর্মী।কিন্তু অভিনয় তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।

রিয়েলিটি দুনিয়ায় তখন গ্ল্যামার যাত্রা। সরাসরি নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করার অফার পেয়ে যাত্রাশিল্পে নাম লেখান মধুমিতা চক্রবর্তী।জন্ম পূর্ববঙ্গে আর বিয়ে হল অবিভক্ত মেদিনীপুরের রামনগরে। স্বামীও যাত্রা ভালবাসেন, যাত্রা করেন নায়কের ভূমিকায়, যাত্রার নাম তমস কুমার। দীর্ঘ ২০ বছর কলকাতার অরূপ দাশগুপ্ত-বীনা দাশগুপ্ত, মোহন চ্যাটার্জী-মিতা চ্যাটার্জী অথবা স্বপন কুমার-স্বপ্না কুমারী হয়ে কাটালেন তমস আর মধুমিতা। পরে বয়স বাড়লে বৌদি থেকে মা। এরই মধ্যে চলে গেছেন চিৎপুরে। কলকাতার নামী দামী অপেরায়। ডাক এসেছে টলিউড থেকেও। সহ শিল্পী হিসাবে জিৎ কিংবা ভিক্টর ব্যানার্জির সংগে কাজ করেছেন।

স্বামী পুত্র-কন্যা মিলে চারজনের সংসার ছিল মধুমিতা চক্রবর্তীর।মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় তারপরে ছেলে আকস্মিক মৃত্যু হয় বছর বারো আগে।তারপর থেকে বেলদা ঠাকুরচকে স্বামীকে নিয়ে থাকতেন যাত্রাশিল্পী মধুমিতা।বিভিন্ন জায়গায় যাত্রা তে অভিনয় করে যেটুকু টাকা সঞ্চয় করেছিলান তার সম্পূর্ণই ব্যয় হয়ে গিয়েছে স্বামীর অসুখের চিকিৎসার কারণে। আর এরই মধ্যে এসেছে লকডাউন। কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি। ৫০ দিন পেরিয়ে গেছে লকডাউনের।যে সময়ে কাজ আসে সেই সময়ে ঘরবন্দি তিনি।নেই কোন মঞ্চস্থ অভিনয়।যাত্রা দলের মালিকের সাথে যোগাযোগ করলেও সদুত্তর নেই।একদিকে ভাড়া ঘরে অনেকটাই বাকি মাসোয়ারা।আর অন্যদিকে দুবেলা-দুমুঠো খাবার এর জন্যই এক কালের ভিক্টর ব্যানার্জি কিংবা অন্যান্য নামিদামি কলকাতার শিল্পীদের সাথে যাত্রা করা সেই শিল্পী পায়ে হেঁটে আজ হাত পাতছে প্রত্যেকটা বাড়ির দরজায় দরজায়।বয়স তার ষাটের ঘরে।গ্রীষ্মের এই ফাঁকা রাস্তায় প্রচন্ড রোদ কে মাথায় নিয়ে ছেঁড়া চটি পরেই তিনি বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করছেন।চাইছেন খানিকটা টাকা।

উচ্চ শিক্ষিত হলেও বয়সের ভার চোখের দৃষ্টি শক্তি ক্ষিন হয়ে আসার জন্য গৃহশিক্ষিকার কাজেও যেতে পারছেন না। আর কেই বা পড়াতে দেবে তাঁকে। রাজ্য সরকার নাকি শিল্পী ভাতা চালু করেছে কিন্তু সে ভাতা ভাত হয়ে ঝরেনি মধুমিতার থালায়। বরং মৃত্যু এসে তাঁকে তাড়াতাড়ি মুক্তি দিয়ে যাক ভগবানের কাছে এমনই কাতর আবেদন জানিয়েছেন বছর ষাটেক মধুমিতা চক্রবর্তী।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Home Breaking E - Paper Video Join