ক্রান্তিকালের মনীষা

ক্রান্তিকালের মনীষা-৩৩ : নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ; বিনোদ মন্ডল

প্রাতঃস্মরণীয়
নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী       বিনোদ মন্ডল

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ। ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া তখন অর্ধেক পৃথিবীর অধীশ্বরী। তিনশ পদস্থ সরকারি কর্মচারীর উপস্থিতিতে এক বাঙালিকে ‘নবাব’খেতাবে ভূষিত করলেন। জনহিতকর কাজে মহান ভূমিকার জন্যে। চমকে উঠল দুনিয়া। চমকে উঠল পরাধীন ভারত। যে মানুষটি সম্মানিত হলেন, তিনি একজন মহিলা। ফয়জুন্নেসা। নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪ – ১৯০৩)।

কী ছিল সেই মহান কীর্তি? ত্রিপুরার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (বর্তমান কুমিল্লা) মিস্টার ডগলাস জেলার উন্নয়নে সহযোগিতার জন্য পশ্চিম গাঁওয়ের মহিলা জমিদার ফয়জুন্নেসার শরণাপন্ন হন। দূরদর্শী জমিদার গুরুত্ব উপলব্ধি করে পরিকল্পনায় ধার্য সমস্ত টাকা সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেন। কারো মতে ঋণের পরিমাণ ষাট হাজার। কারো মতে এক লক্ষ। সেই মহানুভবতার ফলশ্রুতিতে তাঁর নবাব উপাধি প্রাপ্তি। প্রায় দুই শতকের ইংরেজ শাসনে অন্য কোনো নারী এই বিরল সম্মান লাভ করেননি।

বাংলায় মুসলিম নারীদের শিক্ষার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৮৩৪ সালে (যদিও জন্মসাল নিয়ে অনেক মতভেদ আছে) কুমিল্লা জেলার লাকসামের পশ্চিমগাঁও গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা আহমদ আলী চৌধুরী ছিলেন হোমনাবাদের জমিদার। মা আরফানুন্নেসা। তাঁর মাতামহও (নানা) জমিদার ছিলেন। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি পিতৃহীন হন। বাল্যকালে গৃহশিক্ষক সৈয়দ শাহসুফি তাজউদ্দিনের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। সেই পর্দানশীন মুসলিম সমাজে আরবি, ফার্সি, বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ১৮৬০ সালে জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর সাথে বিয়ে হয় তাঁর। যদিও টেকেনি সে বিয়ে।

সেকালে বাঙালি মুসলিম সমাজে নবাব আব্দুল লতিফ (১৮২৭ – ১৮৯৩) এবং সৈয়দ আমির আলী (১৮৪৯ – ১৯২৮) নামক দুই মনীষী, শিক্ষা বিস্তারে অতন্দ্র ভূমিকা পালন করেছেন। তবে তাঁরা শুধু পুরুষদের জন্যই ভেবেছেন। সেখানে জেনানামহল প্রায় অনুচ্চারিত ছিল। একমাত্র ফয়জুন্নেসা এই উপমহাদেশে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের শিক্ষা প্রসারের প্রয়োজনীয়তার বার্তা ঘোষণা করে গেছেন। লাগাতার। তিনি কলকাতার ‘সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মহামেডান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যাও ছিলেন।

শিক্ষার উন্নতি ও প্রসার ছাড়া কোনও জাতি এগোতে পারে না, তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তাই ১৮৭৩ সালে কুমিল্লা শহরে দুটি পৃথক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন মেয়েদের জন্য। একটি নানুয়া দীঘির পশ্চিম পাড়ে। অন্যটি কান্দির পাড়ে। প্রথম বিদ্যালয়টি বর্তমানে শৈলরাণী উচ্চ বিদ্যালয়ে (বালিকা) রূপান্তরিত হয়েছে। সেই নিয়ে একটি মজার কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। আয়কর বিভাগের জনৈক উচ্চপদস্থ কর্মচারী ১৯৩০ সালে দশ হাজার টাকা খরচ করে গোপনে নিজের পত্নী শৈলরাণী দেবীর নামে বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তিত করেন। যা নিয়ে কুমিল্লার বুদ্ধিজীবী সমাজ ক্ষুব্ধ।

কান্দি পাড়ের বালিকা বিদ্যালয়টি তাঁর জীবনের বড় কীর্তি। ১৮৮৯ সালে স্কুলটি জুনিয়র হাইস্কুলের মর্যাদা পায়। যখন কলকাতাতেও কোন বালিকা বিদ্যালয় ছিল না। তিনি প্রথম ইংরেজি মাধ্যমে নারীদের জন্য শিক্ষার প্রাঙ্গণ উন্মুক্ত করেছেন। এই স্কুলের জন্য তিনি পাঁচ একর জমি দান করেছেন। শুধু তাই নয় স্কুলের পশ্চিম প্রান্তে প্রতিষ্ঠা করেন ফয়জুন্নেসা ছাত্রী নিবাস। জমিদারি আয় থেকে এই হোস্টেলের খরচ এবং মেয়েদের উৎসাহ প্রদানের জন্য স্থায়ী মাসিক বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন তিনি।

১৮৯৩ সালে (মতান্তরে ১৯০১) তিনি যে ‘ফয়েজিয়া মাদ্রাসা’ চালু করেন কালক্রমে তা নিউ স্কিম মাদ্রাসায় এবং ডিগ্রী কলেজে (১৯৬৮) রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ সহ পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রী কলেজের মর্যাদা লাভ করেছে। ১৯৮২ – র ১ মে জাতীয়করণের ফলে নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ এর রূপলাভ করে এখনকার উচ্চ শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে উন্নীত হয়েছে। মাদ্রাসাটি তাই বলে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। ১৯৩৫ সালে ডাকাতিয়া নদীর বিপরীত তীরে গাজীমুড়ায় স্থানান্তরিত হয়েছে। যার বর্তমান নাম গাজীমুড়া আলিয়া মাদ্রাসা।

শুধু ওই বাংলায় নয় এপার বাংলার নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরেও তিনি একটি বিদ্যালয় এবং একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারে তিনি শুরুতে জোর দেন। নিজের গ্রামে ১৯০১ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টি বর্তমানে পশ্চিমগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিচিত। নবাবের ছোট মেয়ে বদরুন্নেসা ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বদরুন্নেসা ও ফয়জুন্নেসা সম্মিলিত উচ্চ বিদ্যালয়। যার বর্তমান নাম বি. এন. হাই স্কুল। শুধু তাই নয়, ওয়াকফ্ এস্টেটের অধীনে ১৪টি মৌজাতেই তিনি জমিদারি কাছারির সাথে সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পুকুর খনন করেন। এর সমস্ত ব্যয়ভার জমিদারি এস্টেট বহন করত।

শুধু শিক্ষা বিস্তার নয়, মানবতার সেবায় তিনি অতন্দ্র ছিলেন। গ্রামের গরিব, দুঃস্থ মানুষের জন্য তিনি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। ১৮৯৩ সালে কুমিল্লা শহর লাভ করেছে ফয়জুন্নেসা জেনানা হাসপাতাল। লেডি ডাফরিনের সহায়তায় তার জন্য বিলেত থেকে ডাক্তার ও নার্স এনেছিলেন। সবাই মহিলা। শুধু তাই নয়, কলকাতায় ‘লেডি ডাফরিন হাসপাতাল’ নির্মাণের নেপথ্যেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল।

১৮৯৭ সালের ১১ ডিসেম্বর নিজের গ্ৰামে একটি পৃথক হাসপাতাল চালু করেন। লাকসাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উত্তর পাশে এই দাতব্য চিকিৎসালয়টি আজও বিরাজমান। বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর এখন এই চিকিৎসালয় পরিচালনা করে। শুধু এখানে নয়, সুদূর মক্কায়ও তাঁর সেবার নজির প্রকীর্ণ। ১৮৯৪ খ্রীস্টাব্দে মক্কা নগরীতে হজব্রত পালন করতে গিয়ে ঐতিহাসিক ‘নহরে যুবাইদা’ সংস্কারের কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মক্কার ‘মিসফালাহ’ মহল্লায় একটি মাদ্রাসা ও একটি মুসাফিরখানা স্থাপন করেন তিনি। এজন্য মাসিক তিনশত টাকা বৃত্তি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। মদিনায়ও একটি মাদ্রাসার জন্য মাসিক একশত টাকা বৃত্তি পাঠাতেন তিনি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আইনি জটিলতায় ঐ অর্থ পাঠানো বন্ধ হয়ে গেছে।

কুমিল্লা থেকে কলকাতা– নানা সাময়িক পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন তিনি। পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ‘সুধাকর’ সমকালীন মুসলিম সমাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। ‘মুসলমান বন্ধু’ও তাই, এর জন্য তিনি এককালীন পাঁচশো টাকা তহবিলে দান করেন। ‘ঢাকা প্রকাশ’ ও ‘বান্ধব’ পত্রিকাও তাঁর দ্বারা অনুগৃহীত হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ফয়জুন পাঠাগারের’ বহু গ্রন্থ স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় লুঠ হয়ে যায়। ব্রাহ্ম মহিলাদের নারী কল্যাণ মূলক প্রতিষ্ঠান ‘সখি সমিতি’র জন্যও মহিলা শিল্প মেলা উপলক্ষ্যে দুইশত টাকা এককালীন দান করেন। শোনা যায় এদের একমাত্র মুসলিম মহিলা পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। সমিতির অনুদানকারীদের তালিকায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শীর্ষে থাকত। তার পরেই মুদ্রিত হত নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর নাম।

সাধারণের জন্য শিক্ষাবিস্তারের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।তাঁর ‘রূপ জালাল’ একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ৪৭১ পৃষ্ঠার বিশাল এই গ্রন্থ অধিকাংশ পদ্য এবং কিয়দংশ গদ্যে পরিকল্পিত। এই গ্রন্থে রাজকুমারী রূপবানুর জন্য যুবরাজ জালালের বিরহ জ্বালা বিবৃত। আবেগদীপ্ত ভাষায় লেখিকা মুসলিম সমাজে নারীর অসহায়তা, অভিশপ্ত বহুবিবাহ প্রথা, সপত্নী সংসারে নিরীহ যুবতীদের জীবনযন্ত্রণা বর্ণিত হয়েছে। এখানে হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতের নানা প্রসঙ্গ উদ্ধৃত হয়েছে। রূপ জালাল বাঙালি মুসলিম মহিলা সাহিত্যিকের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা শহরের গিরিশ মুদ্রাযন্ত্র থেকে মুদ্রিত হয়। এছাড়াও পাশ্চাত্য ও দেশীয় সংগীত নিয়ে তিনি দুটি পুস্তক রচনা করেন, ‘সংগীত সার’ ও ‘সংগীত লহরি’।

বাঙালি সমাজে ফয়েজুন্নেসা একটি চির অবহেলিত নাম। ইতিহাসে তিনি যোগ্য মর্যাদা ও সম্মান আজও পাননি। স্বর্ণকুমারী দেবী রচিত ‘দীপ নির্বাণ’ উপন্যাসও সমকালে প্রকাশিত (১৮৭৬) হয়। উনিশ শতকে বাংলার নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে ‘দীপনির্বাণ’ এর পাশাপাশি রূপজালালও একাসন প্রাপ্তির দাবি রাখে। অথচ গ্রন্থটি আজও অবহেলিত, প্রায় দুষ্প্রাপ্য। লেখিকা বেগম ফয়েজুন্নেসা চৌধুরানী আজ বিস্মৃতপ্রায়।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Share
Published by
Chandramani Saha
Tags: Litreture

Recent Posts

Extra Marital Affair: পরকীয়ার ‘ভিডিও’ই কাল! দুই বউ থাকা সত্ত্বেও গোপন সম্পর্ক, পিংলায় গ্রেফতার!

অভিরুপ মাইতি, খড়গপুর: দু’টি বিয়ের পরেও ফের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া, আর তারই জেরে শেষ পর্যন্ত…

৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার জাল নোট-‌সহ আটক সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র! চাঞ্চল্য মালদহে

লক্ষাধিক টাকার জাল নোট-‌সহ আটক সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র। পুলিশ নাবালকের কাছ থেকে ৪ লক্ষ…

রাশিয়ায় স্পেশ‍্যাল অলিম্পিকসে ভারতের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হলেন অভিনেতা সোনু সুদ!

বলিউড অভিনেতা সোনু সুদ করোনার সময়ে সাধারণ মানুষের ত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন। জুটেছিল বাস্তব জীবনের হিরোর…

Gangrape & Murder: বিয়ের নয় পড়াশুনা করতে চেয়েছিল কিশোরী! বদলা নিতে ধর্ষণ করে কীটনাশক খাইয়ে খুন

নিজস্ব সংবাদদাতা: স্কুল কিংবা টিউশন পড়তে যাওয়ার পথে কিশোরীর দিকে চেয়ে থাকত লোলুপ দু'টো চোখ।…

Boy save Train: সাত বছরের খুদে বাঁচিয়ে দিল দ ক্যানিং লোকাল!

বিশ্বজিৎ দাস:- ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পেল ক্যানিং স্টাফ স্পেশাল ট্রেন। তাও মাত্র সাত…

Job: ইতিহাসে ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট! গোল্ড মেডেল শিকয়ে তুলে ডোম পদেই চাকরি চান স্বর্ণালী

নিজস্ব সংবাদদাতা: লকডাউন কেড়ে নিয়েছে তাঁর এবং স্বামীর পেশা। একরত্তি মেয়ে কে নিয়ে সংসার ভাসছে…