আকাশমনির ওপারে চাঁদ হয়েই থেকে যাবেন হিমাংশু

মধুসূদন পাত্র: ২১শে জুলাই,২০২০ রাত তখন সাড়ে এগারোটা। পরিবার পরিজন বিনিদ্র প্রহর গুণে চলেছেন। জীবনের অন্তিম কাল স্পর্শ করে ফেললেন সবার প্রিয়, চোখের মণি হিমাংশু। নিঃশব্দে নীরবে নিজের অনেক কাজ, সাধের সাধনা অসমাপ্ত রেখে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন তিনি। রেখে গেলেন এক উজ্জ্বল অধিকার। গরীব মেহনতি মানুষের বাঁচার লড়াইয়ে সহযোদ্ধা হিশাবে প্রেরণা যোগানোর মশালটি হাতে নিয়ে পথ হেঁটেছেন অক্লান্ত।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে কমরেড হিমাংশু দোলুই যোগ দেন গণনাট্য সংঘের ‘সংহতি’ শাখায়। সুদূর জকপুর থেকে শাখার সদর দপ্তর বুড়ামালাতে আসতেন সাইকেল করে। প্রায় দশ কি.মি. রাস্তা আপ ডাউনে ২০ কি.মি. কতটা মনের জোর থাকলে যাতায়াত করা যায়। রিহার্সাল হ’ত (গান বা নাটকের ) অধিকাংশ দিনই হরিনাতে। ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বাজতো। যদু, উৎপল, শিবানী, লক্ষীকান্তদের নিয়ে মহা উৎসাহে এভাবেই গণনাট্য সংঘের নেতৃস্থানীয় সদস্য হিশাবে দিনের পর দিন কাজ করেছিলেন। পরে জকপুর ডুবগোহালে এমন কি নিজের বাড়িতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। জেলার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন বেশ কয়েকবছর। গান রচনায় নজর কেড়েছেন স্বনামধন্য বাসুদেব দাশগুপ্ত তথা শ্রীজীব গোস্বামীর।

জানতেন জমি জরিপের কাজ। ছুটির দিনে সাংস্কৃতিক কোন প্রোগ্রাম না থাকলে বেরিয়ে পড়তেন। জরিপের সুবাদে কত মানুষের দ্বন্দ্ব সমস্যা যে মিটিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই! মানুষের কাছাকাছি থাকবার পরিসরে মানুষের বিশ্বাস আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন। কত নিষ্ঠায় কত সাধারণ জীবন প্রবাহে ভালবেসে জয় করতে পেরেছিলেন তাঁর চারপাশের আবালবৃদ্ধবনিতাকে তাঁর জীবনই তার প্রমাণ।

ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম সারিতে তাঁর অবদান। তাঁর লেখা গান স্থান পেয়েছিল রাজ্যস্তরের রেকর্ডেড ক্যাসেটে। জনপ্রিয় হয়েছিল তাঁর অমর সৃষ্টি ‘চাঁদ উঠলো আকাশমনির গাছে’। কয়েকটি একাঙ্ক নাটকও লিখেছিলেন তিনি। ভাল অভিনয় করতেন। ‘সংহতি’ শাখার পর ‘সম্প্রীতি’ শাখার কর্ণধার ছিলেন। অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল। ভালবেসে কাছে টেনে নিতে পারতেন সবাইকে। নিরহংকার গুণী মানুষ হিমাংশু উঠে এসেছিলেন
সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে।

একবছরও হয়নি তিনি অবসর গ্রহণ করেছিলেন সেলস্ ট্যাক্স ডিপার্ট্মেন্টের প্রধান করণিক (বড়বাবু) পদ থেকে। সবার প্রিয় ছিলেন সেখানেও। তাঁকে হারিয়ে খড়্গপুর গ্রামীণ এলাকার সাংস্কৃতিক আন্দোলন এক বড় ধাক্কা খেল, সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিসর যখন অত্যন্ত প্রতিকূল তখনো তিনি হাল ছাড়েননি। এই সেদিনও তিনি ঐকতান ক্লাবে(জকপুর) রবীন্দ্রজন্মোৎসবে অসুস্থতা সত্বেও যোগদান করেছেন। জকপুরে অনুষ্ঠিত বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবর্ষ উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। তারিখ ছিল মার্চের ৮। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন তারপর থেকেই।
মৃত্যুকালে স্ত্রী, দুই কৃতী সন্তান ও পুত্রবধূকে রেখে গেলেন। এলাকার সমস্ত মানুষ তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারকে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

Chandramani Saha

চন্দ্রমণি সাহা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক। গতানুগতিক সংবাদের বাইরে গিয়ে মানবিক আবেদন সম্পন্ন গল্প এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরাই তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে তিনি The Khargapur Post-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত।

Share
Published by
Chandramani Saha
Tags: Bibiography

Recent Posts

Extra Marital Affair: পরকীয়ার ‘ভিডিও’ই কাল! দুই বউ থাকা সত্ত্বেও গোপন সম্পর্ক, পিংলায় গ্রেফতার!

অভিরুপ মাইতি, খড়গপুর: দু’টি বিয়ের পরেও ফের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া, আর তারই জেরে শেষ পর্যন্ত…

৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার জাল নোট-‌সহ আটক সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র! চাঞ্চল্য মালদহে

লক্ষাধিক টাকার জাল নোট-‌সহ আটক সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র। পুলিশ নাবালকের কাছ থেকে ৪ লক্ষ…

রাশিয়ায় স্পেশ‍্যাল অলিম্পিকসে ভারতের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হলেন অভিনেতা সোনু সুদ!

বলিউড অভিনেতা সোনু সুদ করোনার সময়ে সাধারণ মানুষের ত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন। জুটেছিল বাস্তব জীবনের হিরোর…

Gangrape & Murder: বিয়ের নয় পড়াশুনা করতে চেয়েছিল কিশোরী! বদলা নিতে ধর্ষণ করে কীটনাশক খাইয়ে খুন

নিজস্ব সংবাদদাতা: স্কুল কিংবা টিউশন পড়তে যাওয়ার পথে কিশোরীর দিকে চেয়ে থাকত লোলুপ দু'টো চোখ।…

Boy save Train: সাত বছরের খুদে বাঁচিয়ে দিল দ ক্যানিং লোকাল!

বিশ্বজিৎ দাস:- ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পেল ক্যানিং স্টাফ স্পেশাল ট্রেন। তাও মাত্র সাত…

Job: ইতিহাসে ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট! গোল্ড মেডেল শিকয়ে তুলে ডোম পদেই চাকরি চান স্বর্ণালী

নিজস্ব সংবাদদাতা: লকডাউন কেড়ে নিয়েছে তাঁর এবং স্বামীর পেশা। একরত্তি মেয়ে কে নিয়ে সংসার ভাসছে…